বুধবার, ১৬ মে, ২০১২

হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের ওপর সরকারি হামলা



ব দ রু দ্দী ন উ ম র
কারও মাথা যখন বিগড়ে যায় তখন তার শেষ অবস্থা। মনে হয় আওয়ামী লীগ এখন সেই অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। আজ ১৬ মে সংবাদপত্রে ‘দেয়াল’ নামে হুমায়ূন আহমেদের একটি উপন্যাস প্রকাশের ওপর হাইকোর্টের এক নিষেধাজ্ঞার রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে যে, শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট ছেলে রাসেলের হত্যা বিষয়ক যে কথা উপন্যাসটিতে লেখা হয়েছে সেটা ভুল। এই ভুল সংশোধন না করা পর্যন্ত উপন্যাসটি হুমায়ূন প্রকাশ করবেন না, হাইকোর্ট এটা আশা করেন। তাদের এই ‘আশা’ করার অর্থ হুকুম জারি। কারণ তাদের আশা অনুযায়ী কাজ না করলে আদালত অবমাননার দায়ে দণ্ডিত বা অন্যভাবে বেইজ্জত হতে হবে।


সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেল এ বিষয়ে বিচারপতি শামসুদ্দীন চৌধুরী ও জাহাঙ্গীর হোসেনের দ্বারা গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের দৃষ্টি আকর্ষণ করার পর তারা এই আশা ব্যক্ত করেন (Daily Star-১৬.৫.২০১২)। একটি suo moto রুল জারি করে আদালত এ সম্পর্কিত সব প্রাথমিক দলিলপত্র অর্থাত্ ভাষ্য সংবলিত কাগজপত্র হুমায়ূন আহমেদকে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে হুমায়ূন সেগুলোর মাধ্যমে নতুন তথ্য এবং সরকারি ভাষ্য সম্পর্কে অবগত হয়ে অর্থাত্ সত্যের সঙ্গে পরিচিত হয়ে তাঁর বইটিতে বলা কথা পরিবর্তন করতে পারেন। মহামান্য আদালত কর্তৃক মিথ্যার পরিবর্তে সত্য প্রতিষ্ঠার এই প্রচেষ্টা প্রশংসাযোগ্য। কিন্তু এখানে কথা আছে। কথাটি হলো এই যে, ঐতিহাসিক ঘটনাসহ যে কোনো ঘটনার সত্যাসত্য নির্ধারণের মালিকানা কারও নেই। কোনো সরকারের তো নেই-ই। আদালতেরও নেই। ঘটনা বিশ্লেষণের কিছু নিয়মকানুন আছে এবং তার চর্চার মাধ্যমে যে কোনো ব্যক্তির অধিকার আছে নিজের ভাষ্য প্রকাশ করার। এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপের অধিকার কারও নেই। যাই হোক, এ ব্যাপারে পরে আসা যাবে। এখন দেখা যাক হুমায়ূনের এবং সরকারের ভাষ্যে কী বলা হয়েছে।
১১ মে দৈনিক ‘প্রথম আলো’ পত্রিকায় হুমায়ূনের ‘দেয়াল’ নামক উপন্যাসের দুটি পরিচ্ছেদ প্রকাশিত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, শেখ মুজিবের দুই পুত্রবধূ ও ছোট ছেলে রাসেল বিছানায় জড়াজড়ি করে থেকে ভয়ে কাঁপছিলেন। যখন ঘাতকরা তাদের কামরায় ঢোকে তখন রাসেল কাপড়ের আলনার পেছনে লুকিয়ে পড়ে ও কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘আমাকে গুলি কোরো না’। ঘাতকরা তাকে সেখান থেকে বের করে হত্যা করে।


অ্যাটর্নি জেনারেল এই বর্ণনার বিরোধিতা করে আদালতকে বলেন যে, দলিলপত্র এবং শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ডের বিচারের রায়ে বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বিক্ষুব্ধ সামরিক অফিসারদের একটি গ্রুপ শেখ মুজিব ও তার পরিবারের ১৩ জন সদস্যকে হত্যা করে। তারা শেখ রাসেলকে শেখ মুজিবের ব্যক্তিগত সহকারী এএফএম মোহিতুল ইসলামের কাছ থেকে এই বলে ছিনিয়ে নেয় যে, তারা তাকে তার মায়ের কাছে নিয়ে যাবে। সে সময় রাসেল মোহিতুল ইসলামকে জিজ্ঞেস করে, তারা তাকে মেরে ফেলবে কি-না। মোহিতুল তাকে বলেন, তারা সেটা করবে না। কিন্তু ঘাতকরা রাসেলকে নিচের তলা থেকে দোতলায় নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। (Daily Star-১৬.৫.২০১২)
প্রথমেই বলা দরকার, শেখ মুজিব হত্যার রায়ে যা-ই বলা থাক, অ্যাটর্নি জেনারেল তার ভিত্তিতে যে বর্ণনা দিয়েছেন তা কোনো সাধারণ বুদ্ধিসম্পন্ন সচেতন লোকের পক্ষে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এর অযৌক্তিক চরিত্র পরিষ্কার বোঝা যাবে যদি সেই রাতে শেখ মুজিবের বাড়ির রাত্রিকালীন অবস্থার কথা চিন্তা করা যায়। সবাই যে যার কামরায় ঘুমিয়ে ছিল। শেখ রাসেলও তার নিজের কামরায় ঘুমিয়ে ছিল। সামরিক বাহিনীর ঘাতকরা বাড়িতে ঢুকে গুলিগালা ও তাণ্ডব শুরু করার পর সবারই ঘুম ভেঙে যায়। সেই অবস্থায় রাসেলের পক্ষে তার দুই ভাবীর কাছে দৌড়ে গিয়ে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা খুব স্বাভাবিক, যখন তার পিতা-মাতাকে এরই মধ্যে হত্যা করা হয়েছে। প্রাণভয়ে কাপড়ের আলনা বা কোনো পর্দার আড়ালে সেই কোমলমতি বালকের আশ্রয় নেয়ার মধ্যে দোষের বা কাপুরুষতার কোনো ব্যাপার নেই। এসব স্বাভাবিক। অন্যদিকে অ্যাটর্নি জেনারেল যে ভাষ্য উপস্থিত করেছেন তা অস্বাভাবিক। বাড়ির অন্যদের যখন হত্যা করা হয়েছে, শেখ মুজিবের লাশ যখন সিঁড়ির ওপর পড়ে আছে, তখন শেখ রাসেল কীভাবে ওপরতলা থেকে মোহিতুল ইসলামের হাত ধরে নিচের তলায় আসতে পারে?
এখানে জোর দিয়ে যা বলা দরকার তা হলো, এ ধরনের ঘটনার কোন ভাষ্য খাঁটি সত্য এটা নির্ধারণের কোনো উপায় নেই। ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের এমন কোনো নির্ধারিত ও সর্বসম্মত নিয়ম নেই, যা দিয়ে কোনো ঘটনার সত্যাসত্য চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যায়। তাছাড়া কোনো ঐতিহাসিক বিষয়ে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করাও চলে না। যে কোনো আদালত কোনো মামলার ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনের ও বিচার পদ্ধতির দ্বারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও রায় প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু সেটা যে সবার মেনে নিতেই হবে, এমন বাধ্যবাধকতা কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নেই।

এক্ষেত্রে অন্য কথার আগে এটা বলা দরকার যে, উপন্যাস ও ইতিহাস এক জিনিস নয়। ঔপন্যাসিক কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা অবলম্বন করে গল্প লেখার সময় ইতিহাস লেখেন না। তাছাড়া ‘দেয়াল’ উপন্যাসের ক্ষেত্রে হুমায়ূন যদি শেখ রাসেলের হত্যাবিষয়ক ঘটনার বর্ণনায় সরকারি ভাষ্য ছাড়া অন্য কিছু বলে থাকেন তাতে এমন কি এসে যায় যাতে অ্যাটর্নি জেনারেলকে এ নিয়ে হাইকোর্টে নালিশ করতে হবে, অগ্রহণযোগ্য হিসেবে বাতিল না করে হাইকোর্টকে ‘আশা’ ব্যক্ত করতে হবে যাতে হুমায়ূন তার বর্ণনা পরিবর্তন করে সরকারি ‘সত্য’ ভাষ্য তার উপন্যাসে নতুন করে লেখেন?
অবস্থা দেখে মনে হয়, ১৫ আগস্ট রাতে ৩২ নম্বর ধানমন্ডিতে শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ডের সময় বালক শেখ রাসেল যে ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে ছিল, ঘাতক মিলিটারি অফিসারের বন্দুকের নল দেখে তাদের পরিবারের সদস্য হিসেবে সাহসী রাসেলের পক্ষে যে পর্দার আড়ালে কাঁপতে থাকা এবং প্রাণ রক্ষার আবেদন করার মতো কিছু ঘটতে পারে না, এটা প্রমাণ করার জন্যই রাসেলের হত্যার সরকারি ভাষ্য তৈরি করা হয়েছে!! ১৯৭২ সাল থেকেই ইতিহাসের ছোট-বড়, গুরুত্বপূর্ণ, এমনকি তুচ্ছ ঘটনার বিকৃত ভাষ্য প্রচার করার যে সংস্কৃতি আওয়ামী লীগ গায়ের জোরে চালু করেছে—এসব হলো তারই ধারাবাহিকতা।

পরিশেষে এটা বলা দরকার যে, সরকারি অ্যাটর্নি জেনারেলের আবেদনের দ্বারা লেখকের স্বাধীনতায় যেভাবে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে আমরা তার তীব্র প্রতিবাদ করি। সরকারের এই হস্তক্ষেপ প্রমাণ করে, বাংলাদেশে সরকারের ফ্যাসিবাদী কার্যকলাপ সমাজের কত গভীর দেশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। জনগণের সভা-সমিতি-মিছিলের অধিকার হরণ থেকে নিয়ে সব রকম রাজনৈতিক কাজের ওপর যেভাবে হাজার রকমভাবে নিষেধাজ্ঞা বলবত্ করে জনগণের টুঁটি টিপে ধরার ব্যবস্থা হয়েছে, হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের ওপর হামলা তার থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যাপার নয়। লেখকদের স্বাধীনতার ওপর ফ্যাসিস্ট হামলার প্রস্তুতিও যে এগিয়ে চলেছে, এর থেকে সেটাই প্রমাণিত হয়। হুমায়ূন আহমেদ এই পরিস্থিতিতে কি করবেন সেটা তার ব্যাপার। তবে আমি এ কথা অবশ্যই বলতে পারি যে, এই ধরনের হস্তক্ষেপ আমি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না। আমি হলে এ নিয়ে আমার ভাষ্য পরিবর্তন তো করতামই না, উপরন্তু প্রয়োজন হলে অবশ্যই পাল্টা মামলা করতাম। 

১৬.০৫.২০১২

রবিবার, ১৩ মে, ২০১২

মন্ত্রিসভা না ঘুষ-দুর্নীতির আখড়া?



ব দ র“ দ্দী ন উ ম র


গত ১৭ এপ্রিল বিশ্বব্যাংকের ঢাকা¯’ প্রতিনিধি অ্যালান গোল্ডস্টেইন পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক কর্তৃক অর্থায়ন বিষয়ে একটি বিবৃতি দেন। তাতে তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ সরকারের কাছে পদ্মা সেতু প্রকল্পে গুর“তর দুর্নীতির তথ্য সেপ্টেম্বর ২০১১ থেকে প্রদান শুর“ করে। বিশ্বব্যাংক নিজস্ব তদন্তে আ¯’া রাখে এবং আমরা বাংলাদেশ সরকারকে জোরালো অনুরোধ করব, যেন দেশের নিজস্ব আইন অনুসারে এই গুর“তর বিষয়ে তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহিতার আওতায় আনে।’ (প্রথম আলো ১০.৫.২০১২)


পত্রিকাটির রিপোর্টে আরও বলা হয় যে, ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগসংবলিত একটি প্রতিবেদন দিয়েছিল। এরপর বিশ্বব্যাংক সূত্র থেকে জানা যায়, ওয়াশিংটনে অব¯ি’ত বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতি প্রতিরোধ সংক্রান্ত সং¯’া ইন্টেগ্রিটির ভাইস প্রেসিডেন্টের দফতর থেকে গত এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে অর্থমন্ত্রীর বাসায় গিয়ে তার কাছে আরও একটি প্রতিবেদন দেয়া হয়। বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, অর্থমন্ত্রীর কাছে দেয়া প্রতিবেদনে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত বলে দু’জনের নাম উল্লেখ করে তাদের বির“দ্ধে ব্যব¯’া নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। কানাডাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এসএনসি লাভালিন সম্পর্কে কানাডা পুলিশের তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য এই প্রতিবেদনে দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনটি হাতে পেয়ে সরকার কোন পদক্ষেপ নেয়নি এবং সরকারপক্ষ থেকে এ বিষয়ে কিছু বলাও হয়নি।
২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে প্রদত্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে, সেতুর মূল অংশের প্রাকযোগ্যতা চুক্তির প্রক্রিয়ায় দুর্নীতিসংক্রান্ত অসংখ্য অভিযোগ পেয়েছে বিশ্বব্যাংক। অভিযোগগুলো মূলত যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন ও তার মালিকানাধীন কোম্পানি ‘সাকো’র উ”চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বির“দ্ধে। যোগাযোগমন্ত্রীর মালিকানাধীন কোম্পানি ‘সাকো’কে অর্থ বা ঘুষ না দিয়ে কাজ পাওয়ার কোন উপায় ছিল না। ‘সাকো’র পক্ষ থেকে ঠিকাদারদের ভয়ভীতি দেখানোর বিষয়টিও বিশ্বব্যাংকের রিপোর্টটিতে উল্লেখ করা হয়।


এরপর যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেনের বির“দ্ধে কোন পদক্ষেপ না নিয়ে তাকে অন্য এক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়! তার কোম্পানির বির“দ্ধেও কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি!! উপরš‘ দুদক এ বিষয়ে নামমাত্র একটি তদন্ত করে বলে যে, বিশ্বব্যাংক-কথিত কোন দুর্নীতির প্রমাণ তারা পায়নি!!! নতুন যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, দুদক তো তদন্ত করে বলেছে যে কোন দুর্নীতি হয়নি! তা ছাড়া সরকার তো যোগাযোগমন্ত্রী, সচিব, পদ্মা সেতু প্রকল্প পরিচালককে মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দিয়েছে। অর্থমন্ত্রীকে রিপোর্ট দেয়া হলেও তিনি কিছুই করেননি! নতুন যোগাযোগমন্ত্রীও তার পূর্ববর্তী যোগাযোগমন্ত্রীকে বেকসুর খালাস করেছেন!! তবে গত ২০-২২ এপ্রিল ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিকে বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে বলে দেয়া হয়েছে যে, দুর্নীতির বির“দ্ধে কোন ব্যব¯’া গ্রহণ না করলে তারা পদ্মা সেতু প্রকল্পে কোন অর্থায়ন করবে না। (প্রথম আলো ১০.৫.২০১২)


বর্তমান হাসিনা সরকারের সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন যে এক মস্ত এবং ঘোরেল দুর্নীতিবাজ, এটা অনেক আগেই বাংলাদেশের লোকের জানা হয়েছিল। শুধু পদ্মা সেতু প্রকল্পই নয়, যোগাযোগের সব ক্ষেত্রে তার দুর্নীতির লম্বা হাত বিস্তৃত ছিল। এ কারণে তাকে মন্ত্রিত্ব থেকে অপসারণের দাবি ব্যাপকভাবে উঠেছিল। কিš‘ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অতি প্রিয় পাত্র এই দুর্নীতিবাজ ও ঘুষখোর আবুল হোসেন। কাজেই তাকে মন্ত্রিত্ব থেকে অপসারণ করা সম্ভব ছিল না। পরে দেশের লোকের সঙ্গে বিশ্বব্যাংক পর্যন্ত যখন তার অপসারণের জন্য জোরালো দাবি জানাল, তখন তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বিদায় না করে অন্য মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হল! অর্থাৎ তার দুর্নীতি, ঘুষখোরি বন্ধ না করে এবং এ জন্য তাকে কোন শাস্তি না দিয়ে অন্যখানে নিয়ে তার নতুন চুরি, ঘুষখোরির ব্যব¯’া করা হল। এক্ষেত্রে শুধু প্রধানমন্ত্রী নন, অর্থমন্ত্রী, নতুন যোগাযোগমন্ত্রীসহ গোটা মন্ত্রিসভাই একজোট হয়ে কাজ করছে। বাংলাদেশে শুধু খুনখারাবি, অপহরণ ইত্যাদির জন্যই যে কারও শাস্তির ব্যব¯’া নেই, তা নয়। নাকের ডগায় ও চোখের সামনে সরকারি মন্ত্রী থেকে নিয়ে আমলারা এবং কর্মী লোকেরা গোপনে তো বটেই, এমনকি প্রকাশ্যে দুর্নীতি, চুরি, ঘুষখোরি করলেও তাদের শাস্তির যে কোনই ব্যব¯’া নেই, এটা দুর্নীতিগ্রস্ত যোগাযোগমন্ত্রীকে মন্ত্রিত্ব থেকে বরখাস্ত না করে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক তাকে শুধু অন্য মন্ত্রণালয়ে বদলি করার বিষয়টি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। এটা রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ঘুষখোরি হাতেনাতে ধরা পড়ার পরও তাকে বরখাস্ত না করে তার মন্ত্রিত্ব বদল করার মধ্যেও দেখা যায়।


বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের মতো দেশগুলোয় ঋণের মাধ্যমে অনেক রকমভাবে সরকারের হাত মোচড় দেয়। কিš‘ তাই বলে নিজেদের দেয়া ঋণ নিয়ে কোন দেশের সরকারি কর্মকর্তারা দুর্নীতি ও চুরি, ঘুষখোরি করবে, এটা তারা করতে দিতে পারে না। কাজেই দুর্নীতির কোন সুরাহা না হলে তারা পদ্মা সেতুর প্রকল্পে কোন অর্থায়ন করবে না, এটা স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দিয়েছে। এর ফলে পদ্মা সেতুর নির্মাণ এখন অনিশ্চিত হয়েছে, অথচ এ সেতু তৈরির ওপর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যাতায়াত ব্যব¯’া এবং অর্থনীতির উন্নতি অনেকখানি নির্ভর করছে।


এক্ষেত্রে অবশ্যই বলা দরকার যে, বিশ্বব্যাংক কর্তৃক যোগাযোগমন্ত্রী ও তার কোম্পানির বড় রকম দুর্নীতির অভিযোগ সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী তার আচরণের মাধ্যমে প্রমাণ করছেন যে, তিনি এই দুর্নীতিবাজ ও ঘুষখোর মন্ত্রীর পক্ষে!
দুদক এখন সরকারের ধামাধরা। তারা একটা নামমাত্র, দায়সারা তদন্ত করে আবুল হোসেনকে নির্দোষ সার্টিফিকেট দিয়েছে! এসব দেখে কেউ যদি বলে যে, যোগাযোগমন্ত্রীর দুর্নীতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী থেকে নিয়ে মন্ত্রিপরিষদের অন্য গুর“ত্বপূর্ণ সদস্যদের সম্পর্ক আছে, তাহলে তাকে কি যুক্তিসঙ্গতভাবে দোষারোপ করা যায়! তাছাড়া এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, আবুল হোসেন এবং যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে বদলি করা হয়েছে। কিš‘ কেন? তারা নির্দোষ হলে তাদের বদলি করা হল কেন? বিশ্বব্যাংক অর্থমন্ত্রীর কাছে দুর্নীতি বিষয়ে যে রিপোর্ট প্রদান করেছে, সে রিপোর্ট জনগণের অবগতির জন্য প্রকাশ করা হ”েছ না কেন? তার মধ্যে যদি কোন ভুল থাকে, তাহলে সে ভুল চিহ্নিত করা জনগণের পক্ষে কঠিন নয়। তা ছাড়া শুধু জনগণই নয়, দেশে অনেক ওয়াকিবহাল এবং বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি আছেন, তারাও রিপোর্টটির বক্তব্য সহজেই যাচাই করতে পারেন। কিš‘ এসব কিছু না করে, রিপোর্টটি গোপন রেখে অর্থমন্ত্রী দুর্নীতির বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার ব্যব¯’াই করেছেন এবং যেহেতু দুর্নীতি বিষয়ে কোন কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পে কোন অর্থায়ন করবে না, এ কারণে তারা এখন এই অর্থায়নের জন্য অনেক অর্থ সং¯’ার দরবারেই টোকা মারছেন!


বাংলাদেশ যে দুনিয়ার মধ্যে সব থেকে দুর্নীতিগ্রস্ত এবং চোর, ঘুষখোররা যে এ দেশের শাসন কাজ পরিচালনা করে, এটা সারা বিশ্বে এক পরিচিত এবং আলোচিত বিষয়। এখন পদ্মা সেতু নিয়ে যে কেলেংকারি যোগাযোগমন্ত্রী থেকে নিয়ে অর্থমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত করছেন, এর থেকে প্রমাণিত হ”েছ যে, নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার এবং তাদের মন্ত্রিসভা দেশের শাসন কাজ পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে পরিণত হয়েছে ঘুষ-দুর্নীতির এক শক্তিশালী আখড়ায়।
১২.৫.২০১২

বুধবার, ৯ মে, ২০১২

সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ



ব দ রু দ্দী ন উ ম র
‘সন্ত্রাসের’ বিরুদ্ধে যুদ্ধই এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডা! তাদের এই এজেন্ডার একটা মহাহাস্যকর দিক আছে। কারণ এই রাষ্ট্রটি আজকের দুনিয়ায় নিজেই সব থেকে মারাত্মক সন্ত্রাসী রাষ্ট্র!! এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকায় খুব কম রাষ্ট্রই আছে যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী হামলার বাইরে। তারা যা করে সেটা শুধু সন্ত্রাসী হামলাই নয়, এই সন্ত্রাসী হামলা সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে পরিচালনা করে তারা দেশের পর দেশ দখলও করে। আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া হলো এর সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত। কিন্তু মিথ্যাচার ও ভাঁওতাবাজিতে সাম্রাজ্যবাদীদের সঙ্গে পাল্লা দেয়া অন্য কারও পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ এই মিথ্যার পেছনে থাকে তাদের গায়ের জোর। কাজেই কোনো দুর্বল দেশ এই ধরনের মিথ্যা বললে বা ভাঁওতাবাজি করলে তাকে যে শাস্তি পেতে হয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার থেকে নিরাপদ থাকে। মিথ্যাচারের যেখানে নিরাপত্তা আছে সেখানে মিথ্যাচর্চা যে অবাধ হবে এটা স্বাভাবিক। কয়েকদিন আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ঢাকায় এসে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সংগ্রামে বাংলাদেশের ভূমিকা ও কৃতকার্যতার ভূয়সী প্রশংসা করেন! আসলে এ সংগ্রাম হলো এমন যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসেরই পরিপূরক এবং সহায়ক। এছাড়া বাংলাদেশের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের অন্য কোনো বোধগম্য অর্থ নেই।হিলারি ক্লিনটন সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে বাংলাদেশের সাফল্যের প্রশংসা করেছেন। এই যুদ্ধ বাংলাদেশ কীভাবে করল? এর একমাত্র দৃষ্টান্ত আমরা দেখি উত্তর-পূর্ব ভারতের কয়েকটি অঞ্চলে যারা নিজেদের ভাষা ও জাতীয়তার ভিত্তিতে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করছে তাদের মধ্যে কয়েকজন বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া নেতাকে গ্রেফতার করে ভারতের হাতে তুলে দেয়া। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো extradition treaty বা বন্দী বিনিময় চুক্তি নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আইন সম্পূর্ণভাবে লঙ্ঘন করে এই গর্হিত কাজ করেছে। এটা ভারতের তো বটেই, এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও বড়ই পছন্দের কাজ!! এই কাজের জন্যই হিলারি ক্লিনটন কর্তৃক ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে’ বাংলাদেশের প্রশংসা!বাংলাদেশে পাকিস্তান বা ভারতের মতো কোনো জঙ্গি তত্পরতা না থাকলেও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কর্তৃক সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে বাংলাদেশের সাহায্যে সন্তোষ প্রকাশের কারণ ভারতের কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে অপহরণ করে গোপনে ভারতের হাতে তুলে দিয়ে মার্কিন স্টাইলে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়া। এদিক দিয়ে বাংলাদেশের কাজ যে কোনো সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের থেকে অন্য প্রকার নয়। কিন্তু সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের পরিচয় এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এই রাষ্ট্রের সন্ত্রাস মূলত অভ্যন্তরীণ। সরকারের বিরুদ্ধে, তাদের রাজনীতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে যারা দাঁড়ায়, তাদের বিরুদ্ধে এদের সন্ত্রাস এখন এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যাতে এই রাষ্ট্রকে চরম সন্ত্রাসী ছাড়া অন্য কিছু বলা যায় না। সাধারণ রাজনৈতিক কাজকর্মে নিযুক্ত, কিন্তু আওয়ামী লীগবিরোধী, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এখন বাংলাদেশ সরকার বেপরোয়া সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হলো এমন এক সন্ত্রাসী রাষ্ট্র যে মূলত আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সন্ত্রাস করে, অন্য দেশের ওপর হামলা করে। বাংলাদেশ হলো এমন এক সন্ত্রাসী রাষ্ট্র যে নিজের দেশের ভেতরেই সন্ত্রাসী হামলা পরিচালনা করে। বিশেষ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া বিদেশিরা তাদের সন্ত্রাসের লক্ষ্যবস্তু হলেও, মূল লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে দেশের জনগণ। ১৯৭১ সালের পর শেখ মুজিবের নেতৃত্বে তত্কালীন আওয়ামী লীগ নিজেদের বেসরকারি ঠেঙাড়ে বাহিনী ছাড়াও রক্ষীবাহিনী নামে এক সরকারি ফ্যাসিস্ট বাহিনী গঠন করেছিল। তাদের মাধ্যমেই অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাস পরিচালিত হতো। সে সময় হাজার হাজার শ্রমিক এবং বিরোধীদলীয় কর্মী ও নেতাকে, বিশেষত বামপন্থীদেরকে, রক্ষীবাহিনী খুন করে গুম করত। নদীতে ফেলে দিত। ১৯৭৫ সালের পর শেখ মুজিবের রক্ষীবাহিনী উঠিয়ে দেয়া হলেও পরবর্তীকালে পুলিশ এবং অন্যান্য বাহিনীর মাধ্যমে একই কাজ করা হতো। ২০০৩ সালে এখানে গঠিত হলো র্যাব। র্যাব গঠনে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশ ও সহায়তা ছিল এটা র্যাবকে শক্তিশালী করার ব্যাপারে তাদের স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রকাশ্য তাগিদ থেকেই বোঝা যেত। সেই র্যাব এখন এ দেশে ক্রসফায়ার ইত্যাদির মাধ্যমে এক ফ্যাসিস্ট বাহিনী হিসেবে জনগণের কাছে পরিচিত হয়েছে। পুলিশের একটা নিয়মকানুন আছে যা মান্য করে চলার থেকে লঙ্ঘিত হয় বেশি। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের একটা জবাবদিহিতা আছে। কিন্তু র্যাবের সে সব কিছুই নেই। এখন সরকার পুলিশ ও র্যাবকে দিয়ে অবৈধভাবে নানা সন্ত্রাসী কাজ করিয়ে নিতে থাকার ফল হিসেবে পুলিশ ও র্যাবের উচ্চ পদস্থ অফিসাররা পর্যন্ত ডাকাতি, খুন-খারাবি, প্রতারণা ইত্যাদি কাজে প্রায় লিপ্ত থাকছে ও কোনো কোনো সময় ধরা পড়ছে। এদের এই কার্যকলাপ এখন রক্ষীবাহিনীর কার্যকলাপের মতোই দাঁড়িয়েছে। অপহরণ, গুম, খুন, ক্রসফায়ার ইত্যাদি এখন তাদের অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসের মূল রূপ।রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের একটা উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ড এখন দাঁড়িয়েছে দেশের জনগণের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস। এ পরিস্থিতিতে সমগ্র জনগণের মধ্যেই নিরাপত্তার অভাব ব্যাপকভাবে অনুভূত হচ্ছে। অপহরণ ও গুম-খুন এখন যে শুধু ওপরতলার রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে তা নয়। এটা এখন এমন আশঙ্কাজনকভাবে বিস্তারলাভ করেছে যে কেউই আর নিজেকে নিরাপদ মনে করে না। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের অনেক অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এখানে এসে কথা বলেছেন। কিন্তু ইলিয়াস আলী ও আমিনুল ইসলামের অপহরণ ও গুম হওয়ার ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করা ছাড়া তাঁর অন্য কোনো বক্তব্য এ ব্যাপারে থাকেনি। এ দুই ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেই উল্লেখ করে তিনি নিজের দায়সারা বক্তব্য দিয়েছেন। এসবই যে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসেরই দৃষ্টান্ত এ বিষয়ে তাঁদের পক্ষে কিছু বলা সম্ভব নয়। কারণ তাঁরা নিজেরাই তাঁদের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোতে এই ধরনের সন্ত্রাস নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিচালনার চক্রান্ত করে থাকেন। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তাদের ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী মিত্ররা এবং ভারতসহ অন্যান্য দেশ বাংলাদেশকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র না বললেও, কার্যত বাংলাদেশ একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্র যেভাবে এখন বিভিন্ন সরকারি বাহিনীর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাস ফ্যাসিস্ট কায়দায় চালিয়ে যাচ্ছে, তাতে বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীনতা বলতে আর কিছু নেই। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সরকারি লোকজন, তাদের নেতানেত্রীরা গদগদভাবে যতই মিথ্যা বলুক, তারা যেভাবে এখন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জনগণের স্বাধীনতা সর্বতোভাবে হরণ করেছে তাতে তাদের কথাবার্তা মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ইত্যাদিকে ভেংচি কাটারই শামিল।৯.৫.২০১২

সোমবার, ৭ মে, ২০১২

মুরবি্বদের বাংলাদেশ সফর


বদরুদ্দীন উমর
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি বিরোধী নেত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তিনি হিলারির সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কথা বলেন। আওয়ামী লীগ এ দেশে গুম, হত্যাসহ যেসব অনাচার করছে সে বিষয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। একজন বিদেশি মন্ত্রীর সঙ্গে দেশের এসব সমস্যা নিয়ে কথা বলার অর্থ এ ক্ষেত্রে তাদের হস্তক্ষেপ কামনা। এটা যে কোনো মতেই সঠিক ও সমর্থনযোগ্য কাজ নয়_ এটা বলাই বাহুল্য। আমরা আমাদের দেশে সাম্রাজ্যবাদীদের হস্তক্ষেপের কথা সবসময়ই বলে থাকি। কিন্তু আমরা যদি নিজেরাই গায়ে পড়ে দেশীয় ব্যাপারে তাদের হস্তক্ষেপ চাই তাহলে সেটা যে দূষণীয় ব্যাপার এতে আর সন্দেহ কি?

দুনিয়াতে বিদেশি রাজনৈতিক নেতা ও কূটনীতিবিদদের আসা-যাওয়া হামেশাই হয়ে থাকে। এর মধ্যে দোষের কিছু নেই। কিন্তু দোষ দাঁড়ায় তখনই, যখন তারা আসেন জমিদারি পরিদর্শনের মতো লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও মেজাজ নিয়ে। এই মাত্র বাংলাদেশে দু'দেশের দুই মন্ত্রী এসে ফেরত গেলেন। তাদের আগমন উপলক্ষে ঢাকায় শুধু সাজসাজ রবই ওঠেনি, মনে হলো তাদের আগমনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে নিয়ে তার সাঙ্গপাঙ্গদের দল এবং বিরোধী নেত্রী নিজেদের ধন্যজ্ঞান করলেন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন আসার আগে থেকেই মার্কিন দূতাবাস ও সরকার পক্ষ থেকে বলা হতে থাকল যে, এই সফর এক যুগান্তকারী ব্যাপার। এর ফলে দু'দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে। বাংলাদেশ অনেক লাভবান হবে। আসলে এ ধরনের কোনো উচ্চ পর্যায়ের কূটনীতিক কোনো দেশে এসে চুক্তি স্বাক্ষর করার আগেই সে চুক্তির খসড়া তৈরি থাকে। দু'দেশের বৈদেশিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ স্থানীয় আধিকারিকদের মধ্যে এর ওপর বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে সেগুলো তৈরি হয়। সফরকারী সরকারি নেতারা তার ওপর সামান্য কথাবার্তা বলে স্বাক্ষর দেন। কাজেই এই নেতাদের ঢাকঢোল পেটানো সফরের আগেই 'যুগান্তকারী' যা হওয়ার তা হয়ে থাকে। তাদের কাজ শুধু হয় গৃহীত সিদ্ধান্তে সিল-ছাপ্পর মারা। কাজেই এক্ষেত্রে 'যুগান্তরকারী' যে ব্যাপারটি ঘটে তা হলো, দু'দেশের নেতৃত্বের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ ও কথাবার্তা, যার গুরুত্ব সৌজন্যমূলকের বেশি নয়। হিলারি ক্লিনটনের সফরের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি সেদেশের একজন খুব গুরুত্বপূর্ণ নেতা। কিন্তু তিনি এসে কোনো চুক্তি বাংলাদেশের সঙ্গে স্বাক্ষর করেননি। বাহ্যত তার সফরের উদ্দেশ্য ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মের সার্ধশতবর্ষের উৎসবের শেষ পর্বে যোগদান। তিনি অবশ্য তার সংক্ষিপ্ত সফরে দ্বিপক্ষীয় কিছু কিছু বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলনেত্রী এবং কিছু সরকারি আধিকারিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তার আগমন নিয়েও এখানে যে হুলস্থূল ভাব দেখা গেল সেটা উপেক্ষা করার ব্যাপার নয়। এর থেকে বোঝা যায় ভারত ও বাংলাদেশের পারস্পরিক সম্পর্কের চরিত্র। এটা বলাই বাহুল্য যে, বাংলাদেশের কোনো মন্ত্রী তো নয়ই এমনকি প্রধানমন্ত্রী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত সফরে গেলে এ ধরনের কোনো হৈচৈ সরকারি প্রশাসনে
হয় না।
এবার প্রণব মুখার্জর্ি রবীন্দ্র উৎসবে আসার কারণে তাকে নিয়ে তুলনামূলকভাবে কোনো বড় হৈচৈ হয়নি। তাছাড়া তিনি বলেই গেছেন যে, দু'দেশের মধ্যে যেসব সমস্যা আছে সেগুলোর সহজ সমাধান এখনই সম্ভব নয়। তার জন্য সময় লাগবে। আরও অনেক দ্বিপক্ষীয় আলোচনার প্রয়োজন হবে। ভারত সরকার আওয়ামী লীগের প্রতি অধিকতর বন্ধুভাবাপন্ন, এ ধারণার বিরোধিতা করে তিনি বলেছেন যে, এটা ভুল। তাদের সম্পর্ক বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের সঙ্গে। কাজেই বাংলাদেশের জনগণ যে দলকেই নির্বাচিত করবে তারা তার সঙ্গে একই রকম সম্পর্ক বজায় রাখবেন। একথা তিনি মিসেস জিয়ার সঙ্গে আলোচনার সময়ে তাকেও বলেছেন। কথাটা একেবারে মিথ্যা নয়। অতীতেও দেখা গেছে, এ দেশের যে কোনো সরকারের সঙ্গেই ভারত একই প্রকার সম্পর্ক রেখে কাজ করে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক খারাপ ছিল এমন বলা যায় না। মিসেস জিয়ার দু'দফা সরকারের সময়ও তাই ছিল। তবে একথা ঠিক যে, শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে বাড়াবাড়ি রকম অধীনতার ভাব দেখায়, যতখানি জোহুজুরগিরি করে, সেটা অন্যদের ক্ষেত্রে একইভাবে দেখা যায় না। যদিও কার্যক্ষেত্রে তাদের মধ্যে পার্থক্য অবশ্যই থাকে। এখানে অবশ্য বলা দরকার যে, এই সফরে এসে নির্বাচন সামনে রেখে ভারতের সব থেকে প্রভাবশালী মন্ত্রী কর্তৃক কোনো দলের প্রতি বিশেষ পক্ষপাতিত্বের কথা অস্বীকার করার বিষয়টি তাৎপর্যহীন নয়।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি বিরোধী নেত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তিনি হিলারির সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কথা বলেন। আওয়ামী লীগ এ দেশে গুম, হত্যাসহ যেসব অনাচার করছে সে বিষয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। একজন বিদেশি মন্ত্রীর সঙ্গে দেশের এসব সমস্যা নিয়ে কথা বলার অর্থ এ ক্ষেত্রে তাদের হস্তক্ষেপ কামনা। এটা যে কোনো মতেই সঠিক ও সমর্থনযোগ্য কাজ নয়_ এটা বলাই বাহুল্য। আমরা আমাদের দেশে সাম্রাজ্যবাদীদের হস্তক্ষেপের কথা সবসময়ই বলে থাকি। কিন্তু আমরা যদি নিজেরাই গায়ে পড়ে দেশীয় ব্যাপারে তাদের হস্তক্ষেপ চাই তাহলে সেটা যে দূষণীয় ব্যাপার এতে আর সন্দেহ কি?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের দেশে এমনিতেই একশ' রকমে হস্তক্ষেপ করে। তাদের রাষ্ট্রদূত ঢাকায় বসে এখানকার সরকার, বিরোধী দল এবং সবকিছু সম্পর্কে ইচ্ছামতো কথাবার্তা বলে থাকেন। আমাদের দেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ নীতি কী হওয়া দরকার এ বিষয়ে তারা বেশ খোলাখুলি নির্দেশের মতো করেই কথা বলেন। এর ভিত্তি যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরেই তৈরি হয়েছে এটা এ দেশের শাসকশ্রেণীর সংকটজনক অবস্থার মধ্যেই দেখা যায়। এই সংকট বাংলাদেশের সমাজ ও শাসন ব্যবস্থার সর্বক্ষেত্রেই ধস নামাচ্ছে। এই ধসে পড়তে থাকা অবস্থায় যে কোনো দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন থাকা তো দূরের কথা, প্রায় খতম হওয়ার মতো অবস্থায় এসে দাঁড়াবে এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশে আজ সেই অবস্থাই বিরাজ করছে।
দুনিয়ার ইতিহাসে সবসময়েই, সব দেশেই দেখা গেছে অভ্যন্তরীণ শাসন দুর্বল ও সংকটজনক হওয়া এবং ভেঙে পড়তে থাকার সময় সে দেশ বহির্শত্রুর আক্রমণের লক্ষ্যস্থল বা টার্গেটে পরিণত হয়। দেশে শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটে। এই সাধারণ নিয়ম বর্তমান দুনিয়াতেও একইভাবে কার্যকর। এ কারণে দেখা যায় যে দেশ অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে যত দুর্বল, সে দেশে বৈদেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতা, অনুপ্রবেশ ও দখলদারি তত বেশি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব আজ কেন বিপন্ন, প্রায় অনুপস্থিত এবং নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে এ বিষয়টি বোঝার জন্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অবস্থার দিকে তাকানো দরকার।
বাংলাদেশের মতো দেশকে বলা হয়ে থাকে নির্ভরশীল (ফবঢ়বহফবহঃ) দেশ। এই নির্ভরশীলতা কার ওপর? নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিয়ে সরকার যাদের কাছে দেনদরবার করে, যাদের থেকে ঋণ নেয়, যাদের সঙ্গে অসম বাণিজ্য চুক্তি করে, যাদের কাছে দেশের সম্পদ পাচার করে, যাদের কাছে বেকার শ্রমিকের জোগান দেয় এবং যাদের কাছ থেকে নিয়মিতভাবে ধমক খায় তারাই হলো বাংলাদেশের মুরবি্ব রাষ্ট্র। বাংলাদেশ হলো তাদের মক্কেল রাষ্ট্র (ঈষরবহঃ ংঃধঃব)। এই রাষ্ট্রগুলো হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, এমনকি সৌদি আরব। এসব দেশের ওপরই বাংলাদেশ আজ নির্ভরশীল।
বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই যে, এসব দেশের উচ্চমার্গের নেতা-নেত্রীরা, এমনটি মাঝারি পদের লোকেরা যখন বাংলাদেশে আসেন তখন এখানকার সরকার ও সফরকারী দেশের প্রতিনিধিদের আচরণ দেখে মনে হয়, সফরকারীরা আসেন জমিদারি পরিদর্শনে। তাদের এই সফরের উদ্দেশ্য সবসময়েই হয় এ দেশের থেকে নানা সুবিধা আদায় ও সম্পদ লুণ্ঠন।
হিলারি ক্লিনটনের উপস্থিতিতে ঢাকায় যে চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে তার কোনো বিবরণ জনগণকে জানানো হয়নি। যেটুকু প্রকাশ করা হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছুই নেই। মুরবি্ব ও মক্কেল দেশের মধ্যে চুক্তির এটা হলো এক সাধারণ দিক। এবারও সরকারিভাবে হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তির যে বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে তাকে বড়জোর বলা চলে একটা ফবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ রহঃবহঃ. সদিচ্ছার ঘোষণা। এর মধ্যে আর কিছু নেই। হিমবাহের মাত্র এক-দশমাংশ যেমন পানির ওপর দেখা যায়, ঠিক সেভাবেই এসব চুক্তির অতি সামান্য অংশই প্রকাশ করা হয়। বাকি অংশ গোপনই থাকে। সেই অনুযায়ীই কাজ হয়। এ কারণে এ চুক্তিগুলোর পূর্ণ বিবরণ কোনো সময়ই জনগণের অবগতির জন্য প্রকাশ করা হয় না। শুধু দেশে এসে বিদেশিরা যেসব চুক্তি স্বাক্ষর করেন সে ক্ষেত্রেই যে এ রকম হয়, এমন নয়। আমাদের সরকারি প্রতিনিধিরা আমেরিকা, ভারত বা এই ধরনের অন্য দেশে গিয়ে যেসব চুক্তি স্বাক্ষর করেন সেসব ক্ষেত্রেও এই একই ব্যাপার। গত বছর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দিলি্লতে গিয়ে ভারত সরকারের সঙ্গে যে চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন তার কোনো বিবরণ আজ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার তারপর থেকে অনেক কিছুই করে চলেছে। সেগুলো যে ওই চুক্তির আওতায় তাতে ওয়াকিবহাল মহলের কোনো সন্দেহ নেই। এবারও হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছে তাতে সামরিক ও বেসামরিক ক্ষেত্রে তাদের কী এজেন্ডা তারা কার্যকর করবে এটা জনগণের জানার কোনো উপায় নেই। তবে এই চুক্তির ভুক্তভোগী যে তারা হবেন, এতে আর সন্দেহ কি?
৭.৫.২০১২

রবিবার, ৬ মে, ২০১২

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে

                                      বদরুদ্দীন উমর


যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের লোকজন ও তাদের ঘরানার বুদ্ধিজীবীর দল যেভাবে ও যেসব আওয়াজ তুলছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, খাজনার থেকে এদের বাজনা অনেক বেশি। এর থেকে সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক যে এরা সত্যি সত্যিই ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায় কি না। এ ক্ষেত্রে উল্লেখ্য, বিচার প্রক্রিয়ার শ্লথগতি এবং এ বিষয়ে নানা বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা সরকারি লোকজন বলতে থাকায় আওয়ামী ঘরানার কোনো কোনো মহলও এ বিচারের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
প্রথমেই বলা দরকার, বিচার প্রক্রিয়া ভণ্ডুল করার চক্রান্তের কথা বলে 'ওই গেল ওই গেল' রব তুলে আওয়ামী লীগ মহলের নেতৃস্থানীয় লোকজন কর্তৃক যেসব কথা প্রায় প্রতিদিন বলা হচ্ছে, তাতে এদের এসব বক্তব্য পরিণত হয়েছে এক হাস্যকর ব্যাপারে। বিএনপি ২৭ জুন হরতাল আহ্বান করেছিল। সে হরতালের সমালোচনা তাদের পক্ষ থেকে করা কোনো দোষের ব্যাপার নয়। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া ভণ্ডুল করার জন্যই হরতাল ডাকা হয়েছে বলে তারা যে আওয়াজ তুলেছিল, তার ফাঁকা চরিত্র খুব স্বচ্ছ। কোনো লোকই এ আওয়াজকে পাত্তা দেননি। কারণ, হরতালের সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিষয়কে যুক্ত করা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার এক ব্যর্থ প্রচেষ্টা বলেই তাঁরা মনে করেছেন। শুধু হরতালই নয়, দেখা যাচ্ছে বিএনপির যেকোনো কাজ, সিদ্ধান্ত বা কর্মসূচির সমালোচনা করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ সব সময়ই তাকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ভণ্ডুল করার চক্রান্ত বলে অভিহিত করছে। এতে নিজেদের জনগণের কাছে খেলো করা এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিষয়কে খেলো করে দেওয়া ছাড়া অন্য কিছুই হচ্ছে না। অবস্থা এ রকম দাঁড়াচ্ছে এ কারণে যে আওয়ামী লীগ বিরোধী দল কর্তৃক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচালের কথা যত জোরেশোরে বলছে, এ বিচারকাজ সুষ্ঠুভাবে সংগঠিত ও ত্বরান্বিত করার ব্যাপারে সরকারিভাবে তেমন কিছুই করছে না।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইস্যু কোনো নতুন ইস্যু নয়। বাস্তবত ১৯৭১ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরই এ বিচার প্রক্রিয়া শুরু ও তৎকালীন পরিস্থিতিতে দ্রুত সম্পন্ন হওয়া দরকার ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ তখন প্রবল প্রতাপে রাজত্ব করলেও তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেনি। শুধু তাই নয়, এর তালিকা প্রক্রিয়া শুরু করে তারা তালিকাভুক্ত ১৯৫ পাকিস্তানি সামরিক অফিসারের বিচার না করে তাদের পাকিস্তানে ফেরত পাঠিয়েছিল। যদিও তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছিল যে সেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাংলার মাটিতেই হবে। সে বিচার হয়নি, তার পরও বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে যাদের আটক করা হয়েছিল তাদেরও ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। তাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছিল নতুন বাংলাদেশ গড়ার কাজে অংশগ্রহণ করতে। এ কাজ শেখ মুজিব তাদের মন্ত্রিসভার কোনো সিদ্ধান্তের মাধ্যমে করেননি। সাংবিধানিকভাবে ক্ষমা ঘোষণা ছিল রাষ্ট্রপতির এখতিয়ারভুক্ত, তবু প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই তিনি এ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন নিজে এই কাজের কৃতিত্ব গ্রহণের জন্য। এ ক্ষেত্রে সব থেকে 'চমৎকৃত' হওয়ার মতো ব্যাপার ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব কর্তৃক ১৯৭১ সালের সব থেকে বড় ও ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধী জুলফিকার আলী ভুট্টোকে শুধু মাফ করে দেওয়া নয়, ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লাহোরে ইসলামী সম্মেলনের সময় তাঁকে পরম বন্ধু হিসেবে আলিঙ্গন করে তাঁর গালে চুমু খাওয়া এবং পরে তাঁকে মহাসম্মানিত রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানিয়ে রাজসিক সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা। এর পর বাস্তবত আওয়ামী লীগের পক্ষে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কোনো নৈতিক অথবা আইনগত ভিত্তি থাকেনি। ১৯৯৬-২০০১ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময়ও তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। শুধু তা-ই নয়, যখনই প্রয়োজন হয়েছে তখনই তারা জামায়াতে ইসলামী এবং অন্য ধর্মীয় সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে সমঝোতা করেছে। এসব কিছুর প্রমাণই সংবাদপত্রের পাতায় ছড়িয়ে আছে, কাজেই কারো কিছু বানিয়ে বলার প্রয়োজন নেই।
১৯৯৬ সালে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিষয়ে কোনো উদ্যোগ না নিলেও এখনকার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে চাপে পড়ে তারা এ উদ্যোগ নিয়েছে। খুব ভালো কথা। কিন্তু উদ্যোগ নেওয়া সত্ত্বেও এ ব্যাপারে যেভাবে অগ্রসর হওয়া দরকার সেটা এদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে এরা নিজেরা ইতিবাচক কাজ করার পরিবর্তে নেতিবাচকভাবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী কর্তৃক এই বিচার ভণ্ডুল ও বানচাল করার ষড়যন্ত্রের কথাই বেশি বলছে।
বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের অধিকাংশই সততার জন্য বিখ্যাত নন। কাজেই সুযোগ বুঝে তাঁরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিষয়ে অনেক গালভরা কথা বললেও আওয়ামী লীগ সরকারের এই নেতিবাচক কার্যকলাপের বিরোধিতা না করে নিজেরাও এর সঙ্গে সুর মেলাচ্ছেন। এ কাজ করতে গিয়ে অনেক ফালতু কথাই তাঁদের বলতে হচ্ছে।
এবার অন্য এক প্রসঙ্গে আসা দরকার। এ প্রসঙ্গে এবং এ বিষয়ে কোনো কথা আওয়ামী মহলে তো শোনাই যায় না, উপরন্তু কেউ সে কথা বললে তাকে স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে আখ্যায়িত করার চেষ্টা করতে দেখা যায়। প্রসঙ্গটি হলো, ১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধ শুধু অবাঙালি ও পাকিস্তানপন্থীরাই করেনি। বাঙালিরাও তখন যুদ্ধাপরাধ করেছে। যুদ্ধাপরাধের অর্থ শুধু স্বাধীনতার সক্রিয় বিরোধিতা নয়। যুদ্ধের সময় নিরপরাধ ব্যক্তি এবং আত্দসমর্পণকারী ব্যক্তিদের হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন করাও অপরাধ। এ কাজ তখন দুই পক্ষেই হয়েছিল। ১৯৭১ সালের মার্চ-এপ্রিলে অনেক অবাঙালি নিরাপরাধ নারী-শিশু-বৃদ্ধ ব্যক্তি বাঙালিদের হাতে নিষ্ঠুরভাবে নিহত হয়েছে। আমি নিজের চোখে এ হত্যাকাণ্ড দেখেছি মার্চ মাসের শেষদিকে। আমার আত্দজীবনী 'আমার জীবন'-এর তৃতীয় খণ্ডে আমি এর বর্ণনা দিয়েছি (জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, পৃষ্ঠা : ১৭২-১৭৩)। এটা এমন ব্যাপার ছিল, যা গোপন বা অস্বীকার করার উপায় নেই।
'মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর' নামে একটি বই ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে 'প্রথমা' প্রকাশনী কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে। গোলাম মুরশিদ লিখিত বইটিতে এ বিষয়ের কিছু উল্লেখ আছে। এর থেকেও মনে হয়, অবাঙালিদেরও যে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা দরকার এবং তাদেরও যে ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার আছে_এ চিন্তা মুক্তিযোদ্ধা নামে পরিচিত লোকদের ছিল না। এ জন্য হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে সে সময় বাঙালিরা এমনভাবে অনেক অবাঙালি নিধন করেছিল, ঠিক যেভাবে বাঙালি নিধন করেছিল অবাঙালি পাকিস্তানিরা। গোলাম মুরশিদ লিখেছেন, "আইন হাতে তুলে নেওয়ার একটি বড় রকমের দৃষ্টান্ত দেখা যায় ১৮ তারিখ মুক্তিযোদ্ধাদের এক সমাবেশে। এই সমাবেশে দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধারা দেশ গড়ার ব্যাপারে সবাইকে উৎসাহ দেন।...কিন্তু এই সমাবেশের পরেই হঠাৎ মুক্তিযোদ্ধারা চারজন 'দালাল'কে পেটাতে আরম্ভ করেন। বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন কাদের সিদ্দিকী। তাঁকে নিয়ে গর্ব করতাম আমরা সবাই। সত্যিকার অর্থে তিনি যেভাবে নিজে একটি বিশাল মুক্তিবাহিনী গড়ে তোলেন, তা বিস্ময়ের ব্যাপার। যেভাবে যুদ্ধ করে তিনি টাঙ্গাইল অঞ্চল দখল করে রাখেন, তাও অবিশ্বাস্য। বস্তুত তিনি সবারই শ্রদ্ধা অর্জন করেন। কিন্তু ১৮ তারিখে 'দালাল' পেটানোর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনিই। শেষ পর্যন্ত তিনি বিদেশি টেলিভিশনের সামনে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে এই দালালদের হত্যা করেন" (মাঈদুল, ১৯৯২)। বলাবাহুল্য, আইন হাতে তুলে নেওয়ার এ দৃষ্টান্ত শ্রদ্ধার বস্তু ছিল না। বহু দেশেই এই ঘটনার ছবি দেখানো হয়। ফলে যুদ্ধের সময় বাংলাদেশের প্রতি বিশ্বসমাজের যে শুভেচ্ছা ও সহানুভূতি তৈরি হয়েছিল, তখন থেকেই তাতে ভাটা পড়তে আরম্ভ করে (পৃষ্ঠা: ১৭৬-'৭৭)। 'কাদের সিদ্দিকী বেয়োনেট দিয়ে এক দালালকে হত্যা করতে যাচ্ছেন'_এই শিরোনামে একটি ছবিও এতে ছাপানো হয়েছে; যাতে দেখা যাচ্ছে কাদের সিদ্দিকী বেয়োনেট দিয়ে একজনকে হত্যা করে আর একজনকে হত্যা করছেন।
এই অবাঙালি নিধনের জন্য যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বাঙালিদের কারো কোনো বিচার হবে এমন চিন্তা বাংলাদেশে দেশদ্রোহিতার শামিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও এর উল্লেখ করা হলো এ কারণে যে এর মধ্যে দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধাদের একটা বড় অংশের উগ্র জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্ট চরিত্রের প্রতিফলন ঘটে, যে চরিত্র কোনো মতেই প্রশংসাযোগ্য নয়।
২৯.৬.২০১০

শনিবার, ৫ মে, ২০১২

বাংলাদেশে স্বাধীন হয়েছে কারা?


ব দ র“ দ্দী ন উ ম র


১৯৭১ সালে একটা যুদ্ধরে মাধ্যমে স্বাধীনতা র্অজন করে আমরা কী পলোম? এটা বশে কছিুদনি থকেইে এ দশেরে জনগণরে এক হƒদয় মোচড়ানো জজ্ঞিাসা। জনগণরে নজিরে কাছে এ প্রশ্ন স্বপ্নে পাওয়া অথবা আকাশ থকেে পড়া নয়। স্বাধীনতা-উত্তরকালে এদশেে যা ঘটে চলছেে এবং এই ঘটনাপ্রবাহে সাধারণ মানুষরে ভাগ্যে কী এসছে,ে তার দকিে তাকালইে জনগণরে এই জজ্ঞিাসার বাস্তব ভত্তিরি দখো পাওয়া যাব।ে


এসব নযি়ে কথার্বাতা নতুন নয়। কন্তিু এমন কছিু কথা বা বষিয় আছে যা পুরান হয় না। বাংলাদশেে জনগণরে দুরবস্থার কথা তমেনই একট।ি বাংলাদশেরে স্বাধীনতা যুদ্ধরে আসল ইতহিাসরে সঙ্গে যারা পরচিতি তারা জাননে য,ে স্বাধীনতা-উত্তরকালে যারা এদশেে রাজা-উজরি হসিবেে গদতিে বসছেলিনে তারা কোন যুদ্ধ ১৯৭১ সালে করনেন।ি ১৯৭১ সালরে ১৬ ডসিম্বেররে পর যারা বপ্লিবী স্বাধীনতাযোদ্ধা হসিবেে অনকে লম্ফঝম্প করে লুটপাটে অংশগ্রহণ করছেলিনে, ক্ষমতার তলোয়ার ঘুরযি়ছেলিনে, তারা ১৯৭১ সালরে যুদ্ধকালীন প্রায় পুরো সময়টা ভারতীয় জনোরলে ওবানরে অধীনে দরোদুনে কমউিনস্টি ও বামপন্থী নধিনরে ট্রনেংি নযি়ছেলিনে। পাকস্তিান জাতীয় ও প্রাদশেকি আইনসভার সদস্যরা যুদ্ধ করার পরর্বিতে কলকাতায় বসে বা শরর্ণাথী শবিরিগুলো পরর্দিশন করে নজিদেরে আখরে গোছাতে ব্যস্ত ছলিনে। এদকি দযি়ে তাজউদ্দীন আহমদরে মতো সামান্য কছিু ব্যতক্রিম উল্লখেযোগ্য। সক্টের কমান্ডাররা সাধ্যমতো চষ্টো করছেলিনে কন্তিু ভারত সরকার যভোবে নানা ধরনরে নযি়ন্ত্রণরে মাধ্যমে তাদরে হাত-পা বঁেধে রখেছেলি (সক্টের কমান্ডার কাজী নূর“জ্জামানরে ‘যুদ্ধস্মৃত’ি দ্রষ্টব্য) তাতে তাদরে করার বশিষে কছিু ছলি না। মোট কথা, ভারত ও পাকস্তিানে যসেব আওয়ামী লীগ নতো ১৯৭১ সালে পলাতক ছলিনে, যারা কোন যুদ্ধ করনেন,ি যুদ্ধরে ধারকোছওে যারা ছলিনে না, তারাই ১৯৭১ সালরে পর স্বাধীন বাংলাদশেে গদনিশনি হয়ছেলিনে। এভাবে গদনিশনি হতে গযি়ে তারা ১৯৭১ সালরে যুদ্ধরে ইতহিাসকে কুৎসতিভাবে বকিৃত কর,ে মথ্যিার পাহাড় বানযি়ে এক কলঙ্কজনক কাজ করছেলিনে। যে কথা চন্তিা করলে মনে হয়, সারা বাংলাদশেই যনে মথ্যিার ওপর ভাসছ।ে


১৯৭১ সালে যুদ্ধরে সময় এদশেরে শ্রমকি-কৃষক মধ্যবত্তি জনগণ চরম আÍত্যাগ করছেলিনে। তাদরে পরবিাররে অসংখ্য ছলেমেযে়ে শুধু সম্মুখযুদ্ধে বা গরেলিা যুদ্ধইে নয়, অন্য নানাভাবে যুদ্ধরে প্রক্রযি়ায় শামলি হয়ছেলিনে। জীবন দযি়ছেলিনে, অঙ্গহানরি কারণে পঙ্গু হয়ছেলিনে। অসংখ্য নরিীহ মানুষকে পাকস্তিানি সনোবাহনিী হত্যা করছেলি, অগণতি নারী তাদরে দ্বারা র্ধষতি হয়ছেলি। লাখ লাখ মানুষ পাকস্তিানি সনোবাহনিীর আক্রমণ ও নর্যিাতন থকেে রহোই পাওয়ার জন্য নজি দশেে পরবাসী হয়ছেলিনে। তারা পরণিত হয়ছেলিনে অভ্যন্তরীণ শরর্ণাথীত।ে এদকি থকেে বচিার করলে পলাতক আওয়ামী লীগ নতোরা ১৯৭১ সালরে যুদ্ধরে কোন ধরনরে নায়ক ছলিনে না। সে যুদ্ধরে প্রকৃত নায়ক ছলিনে এদশেরে জনগণ। আজকাল অসংখ্য লোকরে নামরে আগে লখো হয় ‘বীর মুক্তযিোদ্ধা’। কন্তিু জনগণরে বীরত্বরে কথা কউে সভোবে বলনে না। এসব থকেে মনে হয়, এদশেে স্বাধীনতা আন্দোলন জনগণ করনেন,ি করছেলিনে পলাতক আওয়ামী লীগ নতেৃবৃন্দ এবং তাদরে সাঙ্গপাঙ্গরা। যারা দশেরে জনগণকে অসহায় অবস্থায় ফলেে ভারতে গযি়ে নজিদেরে জীবন রক্ষা করছেলিনে এবং ভারতরে হাতে দশে স্বাধীন করার দায়ত্বি র্অপণ করে নরিাপদ জীবনযাপন করছেলিনে, তারাই বাংলাদশেরে কথতি প্রকৃত বীর মুক্তযিোদ্ধা! তারাই বাংলাদশেরে পরত্রিাতা!!
ভারতীয় সরকার ও সনোবাহনিীর সহায়তায় ও কল্যাণে এই বীর মুক্তযিোদ্ধা ও পরত্রিাতারা ১৯৭১ সালে ক্ষমতাসীন হয়ছেলিনে। ক্ষমতাসীন হওয়ার পরমুর্হূত থকেইে তারা যভোবে লুটপাট শুর“ করছেলিনে এবং জনগণরে ওপর নর্যিাতন চালযি়ছেলিনে, সটো ইতহিাসরে পাতায় লখো হয়ছে।ে সে ইতহিাসকে চাপা দযি়,ে বকিৃত করে এখন যে মথ্যিা ইতহিাস স্কুল পাঠ্যপুস্তকে র্পযন্ত ঘুণ ধরযি়ছে,ে সে ইতহিাস গ্রাহ্য নয়। সে ইতহিাস ঐতহিাসকিভাবইে র্বজতি হব।ে


যারা এই মথ্যিা ইতহিাস নজি নজি দলীয়, পারবিারকি ও ব্যক্তস্বর্িাথে রচনা করছেনে, তারাই প্রথম থকেে বাংলাদশেরে জনগণরে শোষক-নর্যিাতক। তাদরে উৎপীড়নে বাংলাদশেরে জনগণ আজ র্পযন্ত স্বাধীনতার কোন স্বাদ পানন।ি এ পর¯ি’িততিে স্বাধীনতা থকেে নজিদেরে প্রাপ্তরি হসিাব নযে়ার চন্তিা জনগণরে পক্ষে স্বাভাবকি। দখো যাবে য,ে ১৯৭১ সালরে পর থকেে বাংলাদশেে উৎপাদন বডে়ছে,ে দশেে ধনসম্পদ অনকে বৃদ্ধি পযে়ছে,ে দশেরে কছিু লোক অচন্তিনীয় ধনসম্পদরে অধকিারী হয়ে বলিাসতিায় ভাসছ।ে


কন্তিু যারা বপিুল অধকিাংশ, যারা দশেরে ৯০ শতাংশ, তাদরে জীবন আজ র্দুবষিহ। শুধু যে খাদ্য, বাসস্থান, চকিৎিসা, শক্ষিা ইত্যাদরি অভাবই তাদরে জীবনকে ঘরিে আছে তা-ই নয়; তাদরে ওপর রাজনতৈকি নর্যিাতন আজ এমন র্পযায়ে এসে দাঁড়যি়ছেে যা ১৯৭২-৭৫ সময়রে পর আর দখো যায়ন।ি
জনগণরে জীবনে আজ কোন নরিাপত্তা নইে। ক্রসফায়ারে হত্যা, অপহরণ, গুম-খুন, র্ধষণ, ঘরবাড়,ি জমজিমা থকেে উ”ছেদ, কাজরে অভাব, ছাঁটাই, মূল্যবৃদ্ধ,ি ফসলরে উপযুক্ত দাম না পাওয়া ইত্যাদি জনগণরে জীবনে আজ চরম র্দুদশা ডকেে এনছে।ে এ পর¯ি’িততিে এসবরে বরি“দ্ধে প্রতরিোধ আন্দোলন স্বাভাবকি। এ স্বাভাবকি ব্যাপার যাতে ঘটতে না পারে তার জন্য সরকার এখন জনগণরে কণ্ঠ রোধে তাদরে রাজনতৈকি তৎপরতার বরি“দ্ধে সব রকম সম্ভাব্য পদক্ষপেই গ্রহণ করছ।ে


পরাধীন ব্রটিশি আমলে এবং পরে পাকস্তিানওে জনগণরে যে রাজনতৈকি স্বাধীনতা ছলি, বাংলাদশেে এখন আর তা নইে। সবই সরকার কডে়ে নযি়ছে।ে এখন মটিংি-সমাবশে, মছিলিরে জন্য এমনভাবে পুলশিরে অনুমতরি ব্যবস্থা হয়ছেে যাতে স্বাধীনভাবে কোন রাজনতৈকি র্কমসূচি গ্রহণ প্রায় অসম্ভব হয়ছে।ে ঢাকায় এখন প্রসে ক্লাব ও জাদুঘররে সামনে ছাড়া অন্য কোন জায়গাতইে সভা-সমাবশে করতে দযে়া হ”ছে না এবং এভাবে সভা করতে হলওে সটো রাস্তার ওপর দাঁড়যি়ইে করতে হ”ছে। পল্টন ময়দান, মুক্তাঙ্গন ইত্যাদরি মতো জায়গায় যখোনে আগে সব সময়ই সভা-সমাবশে হতো, সখোনে আজ নষিধোজ্ঞা জারি আছ।ে অথচ মুক্তাঙ্গন তরৈি করার সময় বলা হয়ছেলি, সখোনে কোন সভা-সমাবশেরে জন্য কোন সময়ই কারও অনুমতরি প্রয়োজন হবে না। এখন অনুমতি নযি়ে সভা করা তো দূররে কথা, মুক্তাঙ্গন সভা-সমাবশেরে জন্য নষিদ্ধি এলাকা হসিবেে সরকার ঘোষণা করছে!ে


অনুমতসিাপক্ষেে যসেব সভা হয় সখোনে সভার অনুমতি ছাড়াও পৃথকভাবে মাইক ব্যবহাররে অনুমতি নতিে হয়! অনকে সময় সভার সময় র্পযন্ত বঁেধে দযে়া হয়, এবং অতরিক্তি সময় সভা চললে পুলশি হামলা কর!ে! দযে়াল লখিন সরকার আগইে নষিদ্ধি করছে।ে এখন তারা পোস্টার ও লফিলটে র্পযন্ত নষিদ্ধি করার পাঁয়তারা চালা”ছে। শগিগরিই এ নষিধোজ্ঞা তারা জারি করব!ে!! এ ব্যাপারে তারা আদালতরে ওপরও প্রভাব বস্তিাররে চষ্টো চালায়!!! কাজইে কোথায় আছি আমরা? কোথায় যা”ছি আমরা? এ প্রশ্ন আজ স্বাভাবকি। যে দশেে জনগণরে স্বাধীনতায় এ ধরনরে ফ্যাসস্টি হস্তক্ষপে করা হয়, সে দশেরে জনগণকে স্বাধীন বলার কোন সুযোগ নইে। কাজইে স্বাধীন বাংলাদশেরে মানুষ যে আজ পরাধীন এতে আর সন্দহে কী?
এ পর¯ি’িততিে বাংলাদশেে স্বাধীন কারা, এ প্রশ্ন স্বাভাবকি। আগইে বলা হয়ছে,ে ১৯৭১ সালে যারা পলাতক ছলিনে এবং যুদ্ধে যাদরে সাক্ষাৎ ভূমকিা নগণ্য ছলি বা ছলিই না, তারাই ভারতীয় সরকার ও সনোবাহনিীর সহায়তায় বাংলাদশেরে শাসন ক্ষমতায় অধষ্ঠিতি হয়ছেলিনে। তারাই আজ ফুল-েফঁেপে এ দশেে শোষণ-নর্যিাতনরে জাল বস্তিার করে আছনে। সাম্রাজ্যবাদরে কাছে দশেরে স্বাধীনতা বক্রিি করতওে তাদরে অসুবধিা হ”ছে না। না হওয়ারই কথা, কারণ এই স্বাধীনতা র্অজনে যাদরে কোন প্রকৃত ভূমকিা ছলি না তাদরে ও তাদরে বংশধরদরে বাংলাদশেরে প্রতি কোন প্রমে, ভালোবাসা এবং জনগণরে জন্য দরদ ও র্কতব্যবোধ থাকার কথা নয়। সটো নইেও।
আসলে সাম্রাজ্যবাদীরাই শুধু নয়, এদশেীয় শোষক-শাসকরাও বাংলাদশেরে জনগণরে জীবনে এক ধরনরে বহরিাগত। এরা জনগণরে কউে নয়। এ কারণইে জনগণরে জন্য এদরে করণীয় কছিু নইে। কন্তিু এরাই শাসন ক্ষমতায় অধষ্ঠিতি। এদরে শাসন যতদনি র্পযন্ত উ”ছেদ না হ”ছে ততদনি র্পযন্ত জনগণরে উপরোক্ত জজ্ঞিাসা থকেইে যাব।ে বদ্যিমান শোষক-শাসকদরে ক্ষমতার অবসান ছাড়া এই জজ্ঞিাসার অবসান সম্ভব নয়।
৫.৫.২০১২

বৃহস্পতিবার, ৩ মে, ২০১২

কিসের সমুদ্র জয়?



ব দ রু দ্দী ন উ ম র
২৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় আওয়ামী লীগ ও তাদের সরকারের উদ্যোগে শেখ হাসিনার ‘বঙ্গোপসাগর জয়’ উপলক্ষে তাকে এক জৌলুসপূর্ণ সংবর্ধনা দেয়া হয়। বঙ্গোপসাগরে জলসীমা নিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একটা মতপার্থক্য বা বিবাদ বেশ কিছুদিন ধরেই ছিল। মাছ ধরা ও সাগরের তলদেশে তেল-গ্যাসসহ খনিজ সম্পদের ওপর অধিকার নিয়ে এই বিবাদের মীমাংসার জন্য আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশ সরকার ২০০৯ সালে মামলা দায়ের করেছিল। যে কোনো সরকারকেই বর্তমান অবস্থায় এই মামলা বাধ্য হয়েই দায়ের করতে হতো। কারণ এই বিবাদ নিষ্পত্তি ছাড়া কোনো ব্লকই আইনসিদ্ধভাবে বরাদ্দ করা সম্ভব হচ্ছিল না। এই মামলার রায়টি এমন যাতে বাংলাদেশ ও মিয়মানমার উভয় সরকারই সন্তোষ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ একে আখ্যায়িত করেছে সমুদ্র জয় হিসেবে। উপকূলবর্তী দেশগুলোর সমুদ্রসীমা নির্ধারণের জন্য সুনির্দিষ্ট আইন আছে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দাবির যথার্থতা বিচার করে এই আইন অনুযায়ীই ট্রাইব্যুনাল রায় দিয়েছেন। কাজেই এই রায় দ্বারা কোনো দেশের জয় হওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। এ প্রশ্ন যে ওঠে না এটা মিয়ানমার সরকার কর্তৃক এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করা থেকেও বোঝা যায়। কিন্তু ব্যাপারটা এরকম হওয়া সত্ত্বেও এই রায়কে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব বিজয় আখ্যা দিয়ে আওয়ামী লীগ ও তাদের সরকার এক হুলুস্থুল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।
বঙ্গোপসাগরের সীমা নির্ধারণ নিয়ে মামলার নিষ্পত্তি এইভাবে হওয়ায় মিয়ানমার সন্তোষ প্রকাশ করলেও তারা এ নিয়ে কোনো হুলুস্থুল করছে না। কিন্তু বাংলাদেশে সেটা হচ্ছে। এর থেকে অন্য যাই হোক, দুই দেশের শাসক শ্রেণীর ও তাদের সরকারি নেতৃত্বের সাংস্কৃতিক মানের একটা পরিচয় পাওয়া যায়। মিয়ানমারের নেতৃত্বের সাংস্কৃতিক মান বাংলাদেশের নেতৃত্বের সাংস্কৃতিক মান থেকে অনেক উঁচু হওয়ায় রায় নিয়ে লাফালাফির কোনো মানসিকতা তাদের নেই। বিষয়টিকে তারা সহজভাবেই নিয়েছে, যেমনভাবে তা নেয়া দরকার। মিয়ানমার বাংলাদেশ থেকে কোনো দুর্বল দেশ নয়। আকারে এবং খনিজ সম্পদসহ নানা সম্পদে তারা বাংলাদেশের থেকে অনেক বড় ও সমৃদ্ধ। দীর্ঘদিন সেখানে সামরিক শাসন বলবত্ থাকলেও সাধারণ সাংস্কৃতিক মানের উচ্চতার কারণে লাফালাফি ও দম্ভ প্রকাশের প্রবণতা তাদের সামরিক বাহিনীরও নেই। এর জন্য কোনো বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী প্রতিপালনের প্রয়োজনও তাদের হয় না।
এদিক দিয়ে বাংলাদেশ এক বিচিত্র দেশ। শুধু ‘সমুদ্র জয়’ নিয়ে নয়, বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী ও তাদের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সব ক্ষেত্রেই আজ যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, তার মূলে আছে সাংস্কৃতিক মানের এই ভয়াবহ নিম্নতা। দৃষ্টিকে একটু গভীর করলে দেখা যাবে লুটতরাজ, চুরি, দুর্নীতি, প্রতারণা, সন্ত্রাস এবং বর্তমানে সৃষ্ট অরাজকতা—সবকিছুই এই সাংস্কৃতিক অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। এদিক দিয়ে উনিশ ও বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশের সংস্কৃতির আকাশপাতাল পার্থক্য। কীভাবে এই পার্থক্য তৈরি হলো তার সুনির্দিষ্ট কারণ আছে, যা নিয়ে আলোচনার সুযোগ এখানে নেই।
‘সমুদ্র জয়’-এর কথা যখন উঠেছে তখন এ নিয়ে কিছু কথা বলা দরকার। সমুদ্রযুদ্ধে বাংলাদেশের জয় অর্থাত্ তার সীমানা নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত হওয়ায় আসল লাভ হয়েছে সাম্রাজ্যবাদীদের, আমেরিকানদের। তেল কোম্পানি তাল্লো এবং কনোকো ফিলিপসকে বাংলাদেশ গ্যাস উত্তোলনের ইজারা দিয়েছে। কিন্তু জলসীমা নিয়ে বিবাদ থাকায় বাংলাদেশের এ কাজ আইনসিদ্ধ ছিল না। এখন সীমানা চিহ্নিত হওয়ার ফলে বাংলাদেশের সীমানার মধ্যে ইজারাপ্রাপ্ত তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলো পরম নিশ্চিন্তে গ্যাস উত্তোলনের কাজ এগিয়ে নিতে পারবে।
আমেরিকানদের সমুদ্রে গ্যাস উত্তোলনের সুবিধা যে দেয়া হবে এটা আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা বিগত নির্বাচনের আগেই জানিয়েছেন। সেই অনুযায়ী বঙ্গোপসাগরে তাল্লো এবং কনোকো ফিলিপস ইজারা পেয়েছে। শুধু এই একটি ব্লকই নয়, অন্য ব্লকগুলোর ইজারাও এভাবেই একাধিক আমেরিকান কোম্পানিকে যে দেয়া হবে—এটা প্রায় নিশ্চিত ব্যাপার। কাজেই বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমানা নির্ধারণের মাধ্যমে যদি কারও জয় হয়ে থাকে তাহলে সে জয় আমেরিকার, তাদের তেল কোম্পানিগুলোর। একই সঙ্গে তাদের মত্স্য ব্যবসায়ী ইত্যাদির। তারাই প্রকৃতপক্ষে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের জলসীমার ওপর নিজেদের আধিপত্য কায়েম রেখে পাহাড়প্রমাণ মুনাফা অর্জন করবে, বাংলাদেশের হাতে কিছু গুঁজে দিয়ে। অর্থাত্ বঙ্গোপসাগরে তারা বাংলাদেশের হাতে তামাক খাবে।
বঙ্গোপসাগরে ব্লক ইজারা দেয়া সত্ত্বেও তার কোনো আইনগত ভিত্তি আগে ছিল না। এখন তা তৈরি হয়েছে। এক্ষেত্রে বিবাদ নিষ্পত্তির কাজটি করেছে বৈদেশিক মন্ত্রণালয়ের সমুদ্র ডেস্ক। এ কাজ করতে গিয়ে কারও ওকালতির কোনো প্রয়োজন হয়নি। সুনির্দিষ্ট আইন অনুযায়ীই এটা হয়েছে। এতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীর কোনো কৃতিত্ব নেই। সমুদ্রে গ্যাস কোম্পানিগুলোর ইজারা কার্যকর করার তাগিদই এক্ষেত্রে কাজ করেছে। বাংলাদেশের যে কোনো সরকারকেই এই পরিস্থিতিতে এটা করতে হতো। এখন এর ফলে ইজারা থেকে শত শত কোটি আইনি-বেআইনি ডলার লেনদেন হবে। আওয়ামী লীগের আগামী নির্বাচনের খরচও এর থেকে তোলার ব্যবস্থা হবে। আওয়ামী লীগের সমুদ্র বিজয় উত্সবের এটাই হলো মূল কারণ।
সমুদ্র বিজয় উপলক্ষে আওয়ামী লীগ তাদের দল ও সরকারের নেত্রীকে সংবর্ধনা দেয়ার মাধ্যমে যে কৃতিত্ব তাকে দেয়ার চেষ্টা করেছে, সে কৃতিত্বের কানাকড়িও তার পাওনা নয়। যারা এ বিষয়ে ওয়াকিবহাল তারা জানেন যে, এ ধরনের সীমানা নির্ধারণ এই প্রথম নয়। এটা এক প্রচলিত ব্যাপার। কিন্তু এর আগে কোনো দেশকেই একে সমুদ্র জয় হিসেবে আখ্যায়িত করে বিজয় উত্সব পালন করতে দেখা যায়নি। যা অন্য কোনো দেশে এই অবস্থায় দেখা যায়নি, এই বিচিত্র বাংলাদেশে সেটাই কাড়া নাকাড়া বাজিয়ে জনগণকে দেখানো হলো!!
২৮ এপ্রিল সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এক বিরাট মঞ্চ তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর সংবর্ধনার আয়োজন হলো। আওয়ামী লীগের দ্বারা আয়োজিত এই সংবর্ধনা উপলক্ষে মঞ্চে বেশ কয়েকজন অদ্ভুত বুদ্ধিজীবীর উপস্থিতি দেখা গেল। এদের মধ্যে আওয়ামী লীগের খুঁটিতে বাঁধা কয়েকজন বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে নবাগত কয়েকজনও মঞ্চ আলোকিত করেছিলেন। দেশে সুবিধাবাদ এবং বুদ্ধিজীবীদের চরিত্রহীনতা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে—এটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর মতোই ব্যাপার।
খুঁটিতে বাঁধা আওয়ামী বুদ্ধিজীবী সৈয়দ শামসুল হক (যিনি অনেক আগে আওয়ামী লীগের এক সমাবেশে হাসিনাকে ‘দেশরত্ন’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন এবং যিনি নিজের উদ্যোগেই নিজের নামের আগে ‘সব্যসাচী’ লেখার প্রচলন করেছেন) অভিজ্ঞানপত্র নামে একটি চতুর্থ শ্রেণীর রচনা পাঠ করার মধ্য দিয়েই সংবর্ধনা সভার কাজ শুরু হয়। তার পরই শুরু হয় অন্য বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা হাসিনার প্রশস্তি কীর্তন। নাগরিক সংবর্ধনা কমিটির সভাপতি জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, তারা হাসিনার মতো নেতা পেয়ে নিজেদের ধন্য মনে করেন। তিনি আরও অনেকদিন দেশে ক্ষমতার হাল ধরে রেখে জনগণের ও দেশের জন্য কাজ করতে পারবেন, এই আশা তিনি ব্যক্ত করেন। চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী উপস্থিত শ্রোতৃমণ্ডলী ও জনগণের কাছে আকুল আবেদন জানান যাতে তারা শেখ হাসিনার মতো দেশনেত্রীকে আরও অন্তত দুই টার্ম ক্ষমতায় রেখে বাংলাদেশকে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ভোট দেন!!! অন্য চামচাদের কথাবার্তাও ছিল একই রকম যার বিস্তারিত উল্লেখের প্রয়োজন নেই। এই সংবর্ধনা থেকে স্পষ্টই বোঝা গেল যে, বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য যে সঙ্কটজনক পরিস্থিতি তৈরি তারা নিজেরাই করেছে, সে সঙ্কট থেকে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে দেয়া এবং নির্বাচনে ভোটের বাক্স ভর্তি করাই ছিল এই সংবর্ধনার মূল উদ্দেশ্য।
এই সংবর্ধনার আয়োজন যে শেখ হাসিনার নিজের উদ্যোগেই এবং চামচাদের উত্সাহে হয়েছে, এতে সন্দেহ নেই। একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী যে কতখানি নির্লজ্জ এবং আত্মসম্মানহীন আচরণ করতে পারেন, এটা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই সংবর্ধনার মাধ্যমে শুধু দেশের লোককেই নয়, দুনিয়ার লোককেও দেখিয়ে দিয়েছেন। এই সঙ্গে নিজেকে বর্ণনাতীতভাবে হাস্যস্পদ করেছেন।
২.৫.২০১২