শুক্রবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১২

বাংলাদেশে আইনের শাসন ভেঙে পড়েছে


বাংলাদেশে দুর্নীতি-হত্যাকাণ্ডসহ হাজার রকম অপরাধের মাত্রা দৌড় দিয়ে বাড়তে থাকার মূল কারণ এখানে এখন আইনের শাসন বলে আর কিছু নেই। বেড়া যেখানে ধান খায়, রক্ষক যেখানে ভক্ষক, সেখানে এটা হওয়াই স্বাভাবিক। বাংলাদেশে এখন শেয়ারবাজার, ব্যাংক থেকে নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে যে সঙ্কট দেখা দিয়েছে, শ্রমজীবী জনগণের ওপর যে অমানুষিক শোষণ ও আর্থিক নির্যাতন চলছে; তার মূলেও এই একই কারণ। যে দেশে অপরাধীর শাস্তির ব্যবস্থা নেই এবং বিপুল অধিকাংশ অপরাধী যেখানে সরকারের লোক অথবা সরকারের সঙ্গে সম্পর্কিত তাদের পেয়ারের লোক—সেখানে যে ভয়াবহ পরিস্থিতি হওয়ার কথা সেটাই বাংলাদেশে এখন দেখা যাচ্ছে।

এই মুহূর্তে একথা বলার কারণ, নরসিংদীতে মেয়র লোকমান হত্যার চিহ্নিত আসামি আওয়ামী লীগের স্থানীয় মন্ত্রীর ভাইসহ অন্যদের বিরুদ্ধে সমন জারি করতে দেরি করা এবং তারা আত্মসমর্পণ করার পর তাদের সবাইকেই যেভাবে নির্বাচনের ঠিক আগে জামিন দেয়া হয়েছে, এটা ‘ক্রিমিনালদের পৃষ্ঠপোষকতা’ ছাড়া আর কিছুই নয়। যেভাবে এই ক্রিমিনালরা পলাতক থাকার পর আত্মসমর্পণ করে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জামিন পেয়ে নিরাপদে ও বুক ফুলিয়ে জনসমক্ষে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাতে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, সরকারের থেকে জামিনের পূর্ণ আশ্বাস পেয়েই তারা পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। মহামান্য আদালত ও পুলিশের মধ্যে এ দেশে যে অপূর্ব যোগসাজশ দেখা যায়, সেই যোগসাজশ এক্ষেত্রেও কাজ করেছে।

শুধু নরসিংদীর এই ক্রিমিনালরাই নয়, অন্য ক্রিমিনালদের ক্ষেত্রেও একই কথা। নির্বাচনে তাদের দলীয় ক্রিমিনালদের মনোনয়ন দেয়ার ব্যাপারেও আওয়ামী লীগের উত্সাহের অভাব নেই। দেখা যাচ্ছে, নিজেদের দলেই ক্রিমিনাল এবং যারা ক্রিমিনাল নয় তাদের মধ্যে ক্রিমিনালদেরই আওয়ামী নেতৃত্বের পছন্দ! এত পছন্দ যে, নির্বাচনে নিশ্চিত পরাজয় জেনেও তারা নিজেদের দলের ক্রিমিনালদের মনোনয়ন দিতে কোনো অসুবিধে বোধ করে না!! ফেনীর কুখ্যাত ক্রিমিনাল জয়নাল হাজারীর বিরুদ্ধে যেসব ক্রাইমের মামলা ছিল, তা একে একে তুলে নিয়ে কয়েক দিন আগে তার বিরুদ্ধে সর্বশেষ ক্রিমিনাল মামলাও তুলে নেয়া হয়েছে! কাজেই জয়নাল হাজারী এখন আর ক্রিমিনাল নয়, একেবারেই ধোয়া তুলসী পাতা!!

অপরাধীর শাস্তি না হওয়ার পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ যে এখন দুর্বৃত্তের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে, এটা কারও অজানা নয়। এ নিয়ে আমি নিজেও অনেক লেখালেখি করেছি। কিন্তু দুর্বৃত্তগিরি কমে না এসে বাংলাদেশে এত বিশাল আকারে এবং এত বিচিত্র রূপে ছড়িয়ে পড়েছে যাতে এই দেশ এখন আন্তর্জাতিকভাবেও বিশ্বের সব থেকে দুর্নীতিগ্রস্ত এবং অপরাধপ্রবণ দেশ হিসেবে পরিগণিত।

এ বিষয়টি বিবেচনার বিষয় এবং বারবার এ নিয়ে কোনো আলোচনার প্রয়োজনই হতো না যদি এর দ্বারা সমগ্র সমাজ, বিশেষত জনগণের দরিদ্রতম শ্রমজীবী অংশ ক্ষতিগ্রস্ত ও তাদের জীবন উত্তরোত্তর বিপর্যস্ত না হতো। কিন্তু এ সত্ত্বেও নিদারুণ ঘৃণ্য ব্যাপার হলো এই যে, এ নিয়ে ক্ষমতাসীন দল ও জোটের মধ্যেও কোনো আত্মসমালোচনা নেই। জোটের শরিকরা সুবিধাবাদী অবস্থানে থেকে জোটভুক্ত অবস্থায় নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ ও ব্যবহার করলেও তারা নিজেদের গা বাঁচিয়ে সরকারের কিছু সমালোচনা কখনও সখনও করে থাকে। কিন্তু তাদের এই দ্বৈত কর্মের জন্য তাদের সমালোচনার কোনো প্রভাব জনগণের ওপর পড়ে না। উপরন্তু জনগণ তাদের সুবিধাবাদী হিসেবে ধরে নিয়েই তাদের মূল্যায়ন করে থাকেন।

সরকার ও সরকারি লোকজন এমনভাবে নিজেদের তিন বছরের শাসনামলে নানাবিধ ‘অর্জনের’ কীর্তন করে থাকেন যাতে মনে হয় দেশ এখন দুধ-মধুতে ভাসছে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সম্মানের উচ্চ শিখরে আছে। তাদের রঙ-বেরঙের কীর্তিকলাপ যে কীভাবে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তাদের খেলো করছে, তার একটি সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত বাধ্য হয়েই উল্লেখ করতে হচ্ছে। আমাদের দেশে অনেক সময় সমালোচনাকে সমালোচকদের ব্যক্তিস্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিতভাবে দেখার একটা ঐতিহ্য আছে। কিন্তু এর সঙ্গে ব্যক্তিস্বার্থের কোনো সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক আছে জনগণের ও দেশের স্বার্থের।

শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সম্প্রতি জাতিসংঘের সম্মেলনে গিয়েছিলেন। সে সময় লেখক হুমায়ূন আহমেদ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে নিউইয়র্কে ছিলেন। এখনও তিনি সেখানেই আছেন। তার আরোগ্য আমরা কামনা করি। তার সুচিকিত্সা হোক, এটা আমরা চাই। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, এজন্য নিষ্প্রয়োজনে সরকারকে অর্থ ব্যয় করতে হবে এবং সেটাও বৈদেশিক মুদ্রায়। শেখ হাসিনা হুমায়ূনকে তার চিকিত্সার জন্য নিউইয়র্কে দশ হাজার ডলার দিয়েছেন। তার চিকিত্সার জন্য সত্যি যদি এই অর্থের প্রয়োজন হতো তা হলে এর মধ্যে কোনো অসুবিধে ছিল না। কিন্তু কোটি কোটি টাকার মালিক হিসেবে তার অর্থের অভাব নেই। তাছাড়া তার প্রধান প্রকাশক পরম বন্ধু এবং কোটি কোটি টাকার মালিক এক ব্যক্তি সেখানে তার চিকিত্সার জন্য অর্থের জোগান দিচ্ছেন। তাছাড়া হুমায়ূন নিজেও এখান থেকে কোনো কোনো প্রকাশকের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা অগ্রিম নিয়ে গেছেন। কাজেই তার চিকিত্সার জন্য অর্থের এখন অভাব নেই, যাতে প্রধানমন্ত্রীর তাকে দশ হাজার ডলার দেয়ার প্রয়োজন ছিল।

এখানে অবশ্যই বলা দরকার, হাসিনা ও তার সরকার তাদের নিজেদের দলের একজন নেতৃস্থানীয় লোক আবদুর রাজ্জাককে তার চিকিত্সার জন্য লন্ডনে কোনো টাকা দেননি। আওয়ামী লীগ দলীয় রাজ্জাকের দু-একজন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি তার জন্য কিছু অর্থের ব্যবস্থা করেছিলেন, যা চিকিত্সার প্রয়োজনের তুলনায় কম ছিল। এ অবস্থায় আবদুর রাজ্জাক কয়েক দিন আগে লন্ডনে মৃত্যুবরণ করেন। এটা আওয়ামী লীগ দলের জন্য কোনো কৃতিত্বের পরিচয় নয়। এছাড়া অন্য প্রশ্নও আছে। হুমায়ূন আহমেদকে যে অর্থ হাসিনা মহা বদান্যতা দেখিয়ে দান করলেন, এটা কি তিনি নিজের পকেট থেকে দিলেন, না এটা দেয়া হলো জনগণের পকেট থেকে? এ প্রশ্ন কি দেশের জনগণ করতে পারেন না? কেউ প্রশ্ন না করলেও এ প্রশ্ন কি অযথার্থ? তাছাড়া হুমায়ূন আহমেদ নিজেই বা এ টাকা কীভাবে নিলেন? কোনো আত্মসম্মান জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তির পক্ষে এই আচরণ কি শোভনীয়?

এবার আসা যেতে পারে এ প্রসঙ্গে দ্বিতীয় কথায়। মাত্র কয়েক দিন আগে শেখ হাসিনা হুমায়ূন আহমেদকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্তি দিয়েছেন!! হুমায়ূনও তা গ্রহণ করেছেন!!! যিনি ক্যান্সারের মতো গুরুতর রোগের চিকিত্সার জন্য আমেরিকায় গেছেন, তাকে এভাবে জাতিসংঘে বাংলাদেশের উপদেষ্টা করার অর্থ কী? কী উপদেশ তিনি এভাবে দেবেন? এটাও কি তার হাতে জনগণের ট্যাক্সের টাকা তুলে দেয়ার এক কৌশল নয়? নিজেদের দলের পতিত বা প্রায়-বিতাড়িত লোককে তার দুরবস্থার সময় হাসিনা চিকিত্সার জন্য সাহায্য করলে বদান্য ব্যক্তি হিসেবে তার কোনো সুখ্যাতি হতো না। কিন্তু লেখক হুমায়ূন আহমেদকে সম্পূর্ণ নিষ্প্রয়োজনেও এই অর্থ সাহায্য করলে সাহিত্য-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক হিসেবে নিজের জয়-জয়কার হওয়ার কথা চিন্তা করেই যে হাসিনা এ কাজ করেছেন এতে আর কার সংশয় থাকতে পারে? এক্ষেত্রে আবার বলা দরকার, আমরা এভাবে বিষয়টি উত্থাপন ও উল্লেখ করার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো গরিব জনগণের চিকিত্সার কোনো ব্যবস্থা দেশে না থাকা।

যেসব সুবিধা আগে সরকারি হাসপাতালগুলোতে ছিল, সেগুলো তুলে দেয়া যখন হচ্ছে তখন হুমায়ূন আহমেদের মতো একজন ধনাঢ্য ব্যক্তিকে চিকিত্সার জন্য আমেরিকায় গিয়ে অর্থ সাহায্য করে আসা এবং সর্বোপরি তার মতো একজন অসুস্থ ব্যক্তিকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের উপদেষ্টা বানিয়ে মাসে হাজার হাজার ডলার দেয়ার ব্যবস্থা কি দুর্নীতিরই নামান্তর নয়? আমরা হুমায়ূনের সুচিকিত্সা হোক এটা চাই এবং তার পরিপূর্ণ আরোগ্য কামনা করি। কিন্তু তার জন্য আমরা দেশের জনগণের স্বার্থবিরুদ্ধ কোনো কাজ সমর্থনের পক্ষপাতী নই। তাছাড়া এদেশে দুর্নীতি কত বিচিত্রভাবে করা হচ্ছে তার দৃষ্টান্ত হিসেবেও এ বিষয়ে জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করা কর্তব্য বিবেচনা করে এখানে বিষয়টির উল্লেখ করা আমরা প্রয়োজন বোধ করেছি। বিষয়টি খুব নাজুক হলেও এর উল্লেখ থেকে বিরত থাকা কর্তব্য কাজে অবহেলারই শামিল।
[সূত্র : আমারে দেশ-১৯/০১/১২]

বৃহস্পতিবার, ১২ জানুয়ারি, ২০১২

ঢাকায় ভারতের সামরিক উপস্থিতির জন্য বিস্ময়কর প্রস্তাব

বদরুদ্দীন উমর


ভারত ও বাংলাদেশ প্রতিবেশী রাষ্ট্র। শুধু তাই নয়, ১৯৪৭ সালের আগে উভয়েই ভিন্ন একটি রাষ্ট্রের অন্তর্গত ছিল। সুদূর প্রাচীনকাল থেকে ব্রিটিশ শাসনের শেষ পর্যন্ত এ দুই দেশের ইতিহাস অভিন্ন। শুধু দুই দেশ নয়, পাকিস্তানকে হিসাব করলে তিন দেশের ইতিহাসই দক্ষিণ এশীয় উপমহাদেশের অভিন্ন ইতিহাস। সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তে ওই উপমহাদেশ বিভক্ত হওয়ার পর থেকে ১৯৪৭-পরবর্তীকালে ভারত ও পাকিস্তান স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠে। পরে পাকিস্তান বিভক্ত হয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির পর দক্ষিণ এশিয়া এখন ত্রিধাবিভক্ত হয়েছে। কিন্তু ১৯৪৭ সাল থেকে ৬৩ বছরের স্বাতন্ত্র্য সত্ত্বেও এ অঞ্চলের জনগণ শত শত বছরের সামাজিক আদান-প্রদান, চিন্তাধারা ও শাসনসূত্রে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ সম্পর্কের ঐতিহ্য কৃত্রিম বিভাজনের কারণে বিনষ্ট হওয়ার নয়। কাজেই অনেক বিভিন্নতা সত্ত্বেও ভারতীয় উপমহাদেশ বা দক্ষিণ এশিয়া নামে পরিচিত, তিন রাষ্ট্রে বিভক্ত, এ দেশের জনগণের চিন্তাচেতনা ও সংস্কৃতির মধ্যে যে ঐক্য ও বন্ধন দেখা যায়, সেটা অন্য কারো সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। এর ফলে এমনি ঘোরতর বিশ্বাস জনগণের মধ্যে যে সৌহার্দ্য ও সুসম্পর্ক আছে রাষ্ট্রীয় দ্বন্দ্ব ও বৈরিতা সত্ত্বেও, এটা এক সুখকর বাস্তবতা। বিশেষ বিশেষ সময়ে দ্বন্দ্ব-বৈরিতার পরিবর্তে যেকোনো দুই রাষ্ট্রের মধ্যে কিছুটা সুসম্পর্ক যখন হয়, তখন জনগণের মধ্যকার ওই সৌহার্দ্য স্পষ্টভাবেই দেখা যায়। এটা ভারত-পাকিস্তান, ভারত-বাংলাদেশ, এমনকি পাকিস্তান-বাংলাদেশের জনগণের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে দেখা যায়। এটিই স্বাভাবিক, কারণ যেসব স্বার্থ নিয়ে এ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বৈরিতা ও দ্বন্দ্ব-সংঘাত থাকে, সেসব স্বার্থ জনগণের নয়। এই রাষ্ট্রগুলোর প্রতিটিতে শাসনকাজ যে শ্রেণী বা শ্রেণীদের দ্বারা পরিচালিত হয়, তারা জনস্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে না, এর পরও জনগণকে শোষণ ও দমন-পীড়ন করে তারা নিজেদের শাসনব্যবস্থা বলবৎ রাখে। নিজেদের শাসনস্বার্থেই এই রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের সঙ্গে দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, যে দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষের সঙ্গে এই রাষ্ট্রগুলোর জনগণের কোনো সম্পর্ক থাকে না। তবে তারা সব সময়ই চেষ্টা করে আন্তরাষ্ট্রীয় বৈরিতা ও দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষকে জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে। তাদের এ চেষ্টা তারা কত ধরনের কৌশলের মাধ্যমে করে, তার কোনো হিসাব নেই।

ভারত বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতম প্রতিবেশী দেশ। এই দুই দেশের জনগণের মধ্যে দীর্ঘদিনের গভীর সম্পর্ক। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ লাখ লাখ পরিবারকে বিভক্ত করেছিল। তারা দুই দেশেই ছড়িয়ে আছে। কাজেই দুই দেশের মধ্যে যে শুধু প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক আছে তাই নয়, রক্ত ও আত্দীয়তার বন্ধনও উপেক্ষার নয়। কিন্তু এসব সত্ত্বেও দেখা যাবে যে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অসম ও বৈরী নীতির কারণে শক্তিশালী প্রতিবেশী ভারত দুই দেশের মধ্যে তিক্ততার সম্পর্ক সৃষ্টি করছে। ১৯৭১ সালে ভারতের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের যে বন্ধুত্ব ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল, তার মধ্যে পরিবর্তন ঘটেছে। পরবর্তী পর্যায়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে ভারত বাংলাদেশের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশকে তার শাসকশ্রেণীর স্বার্থে ব্যবহারের যে চেষ্টা করে আসছে, তার ফলে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে।

এখানে লক্ষ করার বিষয়, বর্তমানে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে যে তিক্ত সম্পর্ক অনেকাংশে সৃষ্টি হয়েছে, সে তিক্ততা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নেই। ভারত বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমেই এখন এ দেশে তার নিয়ন্ত্রণ নানাভাবে কার্যকর করতে নিযুক্ত হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, সড়কপথ ও বন্দর, নদীর পানি ইত্যাদি ক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশে নিজের স্বার্থ উদ্ধার করলেও বাংলাদেশ তার বিনিময়ে প্রকৃতপক্ষে উল্লেখযোগ্য কিছুই পাচ্ছে না। এর দ্বারা জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং তাঁদের ওপর এই নীতি ভারত ছড়িয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশে সরকারের মাধ্যমেই। বাংলাদেশ সরকার এভাবে ভারত সরকারের তাঁবেদার হিসেবেই কাজ করছে।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই লম্বা ভূমিকার কারণ, ঠিক এ মুহূর্তে ভারত এমন এক কাজের জন্য বাংলাদেশ সরকারের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করছে, যা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে সরাসরি উপেক্ষা ও পদদলিত করার শামিল। ভারত বলেছে, বাংলাদেশে যাতায়াতকারী ভারতীয় বিমানের নিরাপত্তার জন্য তারা এখানে সশস্ত্র 'স্কাই মার্শাল' পাঠাবে, যারা ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে অবস্থান নেবে। এই বিশেষ সামরিক বাহিনী বিমানবন্দরে অবস্থান করতে পারবে। এ জন্য তাদের তিন সদস্যের একটি টিম ঢাকায় এসে এখানকার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত করেছে। এভাবে ভারতের স্কাই মার্শাল বাংলাদেশে মোতায়েন করার কারণ বাংলাদেশে নাকি ইসলামী জঙ্গি তৎপরতা খুব বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তার ফলে ভারতীয় বিমানের নিরাপত্তা এখানে বিঘি্নত হওয়ার আশঙ্কা। সেটা যাতে না হয়, তার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা এবং সে রকম কোনো আশঙ্কা রোধের জন্য ভারত ঢাকা বিমানবন্দরে তাদের নিজস্ব সামরিক ও গোয়েন্দা বাহিনী নিয়োজিত রাখার উদ্যোগ নিয়েছে।

সংবাদপত্রের রিপোর্ট থেকে দেখা যায়, এভাবে বাংলাদেশে ভারতীয় স্কাই মার্শাল নামে তাদের সামরিক বাহিনীর অবস্থান গ্রহণের ব্যাপারে এখানকার গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আপত্তি জানিয়ে বলেছে, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা যথেষ্ট সুরক্ষিত এবং ভারতসহ কোনো দেশের বিমানের নিরাপত্তাজনিত কোনো সমস্যা এখানে দেখা যায়নি এবং তাদের কাছে এ বিষয়ে কোনো তথ্যই নেই। কাজেই হঠাৎ ভারতীয় বিমানের নিরাপত্তার জন্য এখানে তাদের সামরিক বাহিনীর সরাসরি উপস্থিতি এবং অবস্থান গ্রহণের কোনো যৌক্তিকতা নেই। এটা সম্পূর্ণ নিষ্প্রয়োজন।

বাংলাদেশে আল-কায়েদাসহ অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনের তৎপরতা রয়েছে বলে ভারত সরকার যে কথা বলেছে, তার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। এ ধরনের কোনো তৎপরতা দ্বারা বিমানবন্দরে বিমান ওঠানামা তো নয়ই, কোনো ক্ষেত্রেই কোনো বিঘ্ন ও বিপদ সৃষ্টি হয়নি। কাজেই ভারতীয় বিমানের নিরাপত্তার জন্য তাদের এই বিশেষ ব্যবস্থা অনুমোদন করার অর্থ হলো, দেশের সার্বভৌমত্ব ভারতের কাছে সমর্পণ করা। আসলে ভারত যেভাবে তাদের সামরিক বাহিনী বিমানবন্দরে মোতায়েন করার কথা বলেছে, এটা বিশ্বের কোনো দেশের কোনো বিমানবন্দরেই নেই। একটি দেশ অন্য দেশে নিজের বিমানের নিরাপত্তার জন্য যদি নিজস্ব সামরিক বাহিনী মোতায়েন করতে চায়, তাহলে অন্য দেশও সেটা চাইতে পারে এবং এখানে এ অনুমতি দিলে অন্য ক্ষেত্রে সেটা না দেওয়ার যুক্তি থাকে না। এর অর্থ দাঁড়ায়, নিজেদের দেশের বিমানবন্দরকে নানা দেশের সামরিক বাহিনীর ঘাঁটিতে পরিণত করা। এর থেকে একটি দেশের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিপজ্জনক ব্যাপার আর কী হতে পারে? কাজেই ভারত নিজেদের বিমানের নিরাপত্তার নাম করে এখানে সামরিক বাহিনী মোতায়েন করার যে প্রস্তাব করেছে, এটার উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ অন্য কিছু এবং একে বাংলাদেশের ওপর ভারতের সাম্রাজ্যবাদী হামলা ছাড়া অন্য কোনোভাবে আখ্যায়িত করা চলে না।

কিন্তু ভারত শুধু বিমানবন্দরে তাদের বিমানের নিরাপত্তার জন্যই নয়, তাদের দূতাবাসের নিরাপত্তার জন্যও সেখানে ভারতীয় সশস্ত্র আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন রাখার ব্যবস্থা করছে। এটাও এক ব্যতিক্রমী ব্যাপার। বহু দেশের দূতাবাসই ঢাকায় আছে, তাদের নিরাপত্তা বাংলাদেশের দায়িত্ব এবং সে দায়িত্ব বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী পালন করে থাকে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভারত নিজেদের দূতাবাসের নিরাপত্তার জন্য নিজেদের সশস্ত্র সামরিক বাহিনী রাখার প্রস্তাব কী কারণে করতে পারে এবং বাংলাদেশ সরকার কী কারণে তাদের প্রস্তাবে সম্মত হয়_এটা স্বাভাবিক অবস্থায় কোনো বোধগম্য ব্যাপার নয়।

বাংলাদেশের প্রতি ভারতের এই আচরণ এবং এখানে সামরিক উপস্থিতির জন্য সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগের ব্যাপারটি কোনো সুপ্রতিবেশীসুলভ ব্যাপার নয়। খুব স্পষ্টভাবেই এটা একধরনের সাম্রাজ্যবাদী আচরণ। এ ধরনের সাম্রাজ্যবাদী আচরণের অর্থ যে বাংলাদেশের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব স্থাপন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। বাংলাদেশ সরকার যদি ভারতের এই চাপের কাছে নতিস্বীকার করে বিমানবন্দর, ভারতীয় দূতাবাস এবং তাদের অন্যান্য স্থাপনায় ভারতীয় সামরিক বাহিনীকে অবস্থান গ্রহণের অনুমতি দেয়, তাহলে সেটা হবে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা এবং দেশীয় স্বার্থ সম্পূর্ণ বিসর্জন দিয়ে ভারতের কাছে আত্দসমর্পণ। বাংলাদেশ সরকার যদি ভারতের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান না করে ঢাকায় তাদের সামরিক উপস্থিতিতে সম্মত হয়, তাহলে তার খেসারত এ সরকারকে অবশ্যই দিতে হবে। জনস্বার্থ ও দেশীয় স্বার্থের প্রতি এই বেইমানির প্রতিশোধ জনগণ অবশ্যই নেবে।
[সূত্রঃ কালের কণ্ঠ, ২৭/০৫/১০]

জনগণকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের চক্রান্ত

বদরুদ্দীন উমর


বর্তমান সরকারের কাছে যা প্রত্যাশিত অবশেষে তা-ই হয়েছে। জনগণের স্বার্থ, তাদের ভিটেমাটি, আবাদি জমি সবকিছুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তারা ঠিক করেছে বড়পুকুরিয়া ও ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করবে। ফুলবাড়ী থেকে এশিয়া এনার্জিকে জনগণ আন্দোলনের মাধ্যমে বিতাড়িত করার পর তারা এ দেশ থেকে চলে যায়নি। তারা ঢাকায় বসেই নানা চক্রান্তে লিপ্ত ছিল। কারণ তারা বাংলাদেশের শাসকশ্রেণীর এবং তাদের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ও আমলাদের চরিত্র ভালোভাবেই জানে। তারা জানে কিভাবে এসব সরকারি দলের নেতা-নেত্রীকে এবং আমলাদের বশ করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করতে হয়। তাদের এই জানাশোনার ভিত্তিতে তারা এটা ধরে রেখেছিল যে তাদের বিরুদ্ধে যতই আন্দোলন হোক, সরকার তাদের পক্ষে, সে সরকার বিএনপির হোক অথবা হোক আওয়ামী লীগের। এদিক দিয়ে তাদের কোনো অসুবিধা নেই। তাদের অসুবিধা শুধু জনগণের প্রতিরোধ নিয়ে। মনে হয় এখন তারা কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়েছে যে তারা আবার ফুলবাড়ীতে ফিরতে পারবে বিশেষ কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই।

কিন্তু শুধু ফুলবাড়ীতেই নয়, বড়পুকুরিয়ায়ও তারা উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এই সিদ্ধান্ত যেভাবে ঘোষিত হয়েছে সেটা আকস্মিক মনে হলেও এর জন্য এক বছর ধরে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট মহলের মধ্যে অনেক চক্রান্তমূলক আলাপ-আলোচনা হয়েছে, অনেক লেনদেন, ভাগবাটোয়ারার হিসাব কষা হয়েছে। এসব চক্রান্তমূলক আলোচনা ও হিসাব-নিকাশ শেষে এখন সরকার ঘোষণা করেছে যে তারা বড়পুকুরিয়া ও ফুলবাড়ী উভয় জায়গায়ই উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করবে।

এ প্রসঙ্গে ঠিক বছরখানেক আগের এক গোলটেবিল বৈঠকের কথা বলা দরকার। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর কয়েকজন অনাবাসী জ্বালানিবিশেষজ্ঞ ও সরকারি কর্মকর্তারা যমুনা রিসোর্টে এ বৈঠক করেন। তাতে যোগদানকারীদের মধ্যে একজন হলেন মহম্মদ খলিকুজ্জামান। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লক হাভেন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। The Quarry Quardary নামে তাঁর একটি প্রবন্ধ আজ (১.৬.২০১০) Daily Star পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তাতে তিনি বলেছেন, ১৫-১৮ জুন, ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত সেই গোলটেবিল বৈঠকে তিনিসহ আটজন অনাবাসী বিশেষজ্ঞ উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া তাতে উপস্থিত ছিলেন জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, দুজন প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু ও মুস্তাফিজুর রহমান, জ্বালানি সেক্রেটারি মহম্মদ মহসীন, পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান হোসেন মনসুর এবং উত্তরবঙ্গের কয়েকজন সংসদ সদস্য।
সরকার কর্তৃক আয়োজিত এই বৈঠকে প্রস্তাবিত কয়লানীতি এবং কয়লা উত্তোলন বিষয়ে আলোচনা হয়। প্রকাশিত কয়লানীতি এবং কয়লা উত্তোলন পদ্ধতি নিয়ে অনাবাসী জ্বালানিবিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতানৈক্য হলেও কতগুলো সুপারিশের ব্যাপারে সব অংশগ্রহণকারীই একমত হন। গোলটেবিল বৈঠক শেষে যমুনা রিসোর্টে ১৮ জুন, ২০০৯ এক সংবাদ সম্মেলনে এই সুপারিশগুলোর বিবরণ প্রকাশ করা হয়। মহম্মদ খলিকুজ্জামান তাঁর উলি্লখিত প্রবন্ধে বলেন, সে সময় মনে হয়েছিল অনাবাসী বিশেষজ্ঞ গ্রুপ যেসব সুপারিশ করেছে সেগুলো সরকার কর্তৃক বিবেচিত হবে। কিন্তু পরে দেখা গেল তা হয়নি। এ বছর ২৬ মে Energy Bangla নামে পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে, সরকার বড়পুকুরিয়া ও ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এই পত্রিকাটি হলো এশিয়া এনার্জির কয়লা উত্তোলন সম্পর্কিত প্রস্তাবের সমর্থক। এদের কাছে সরকারের এই সিদ্ধান্তের খবর আগেভাগেই কিভাবে পেঁৗছাল সেটা এক বড় প্রশ্ন।

এখানে উল্লেখ করা দরকার যে কিছুদিন আগে কয়েকজন উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা জার্মানি সফর করেন সেখানে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন দেখার জন্য। পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী এই সফরের ব্যবস্থা ও ব্যয় বহন করে এশিয়া এনার্জি করপোরেশন (AEC, এখন নাম পরিবর্তন করে হয়েছে GCM)। যাদের উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের প্রস্তাব ও প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে ফুলবাড়ীতে এলাকার জনগণ প্রবল আন্দোলন করল, যাদের এই প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে অন্যত্রও আন্দোলন হলো, অনেক লেখালেখি হলো এবং এসবের পরিণতিতে ফুলবাড়ী থেকে এশিয়া এনার্জি কম্পানি বিতাড়িত হলো, তাদেরই টাকায় সরকারি কর্মকর্তারা উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের জন্য জার্মানি সফর কিভাবে করলেন? এটা কী ধরনের নৈতিক বিবেচনা এবং গণতান্ত্রিক রীতি অনুযায়ী সম্ভব এটা বোঝার উপায় নেই। শুধু তাই নয়, এর মতো ন্যক্কারজনক ব্যাপার এ ধরনের নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে আর কী হতে পারে? কিন্তু বাংলাদেশ এক বিচিত্র ভূমি। এখানে দুর্নীতিবাজরা করতে পারে না এমন কাজ নেই।

যে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ কম্পানি নিজেরা আমাদের দেশে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের প্রস্তাবক ও চক্রান্তকারী এবং ঘোষিতভাবে এই পদ্ধতির পক্ষে, তারা যখন সরকারি কর্মকর্তাদের অন্য দেশে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন দেখে আসার জন্য নিজেদের ব্যয়ে সফরের ব্যবস্থা করে, তখন তার অর্থ বোঝার অসুবিধা কার হতে পারে? যেখানে কয়লা উত্তোলন পদ্ধতি নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক তো চলছেই, উপরন্তু এ নিয়ে এশিয়া এনার্জির বিরোধিতা হচ্ছে রাজনৈতিভাবে, সেখানে এই বিতর্কের এক পক্ষের পয়সায় সরকারি কর্মকর্তাদের সফর করার অর্থ হলো সেই পক্ষের নুন খেয়ে নিমক হারামি করা ছাড়া আর কি? এই নিমক হারামিই তাঁরা করেছেন। শুধু তাঁরাই নয়, বাংলাদেশের মন্ত্রিসভাও এখন এশিয়া এনার্জি এবং উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের পক্ষে। গত বছর জুন মাসে অনাবাসী জ্বালানি বিশেষজ্ঞরাসহ সরকারি কর্মকর্তারা মিলে কয়লা উত্তোলনের ব্যাপারে যেসব বিষয়ে একমত হয়েছিলেন, তাতে কোনো বিশেষ পদ্ধতিকে অগ্রাধিকার না দিয়ে এমন পদ্ধতি অনুসরণের কথা ছিল, যাতে নির্দিষ্ট কোনো কয়লাক্ষেত্রে ভূতাত্তি্বক, পানি-ভূতাত্তি্বক, পরিবেশ ও আর্থসামাজিক অবস্থার হিসাব করে পদ্ধতি নির্ধারণের কথা ছিল। কিন্তু এক বছর ধরে এসব নিয়ে কোনো আলোচনা ও কথাবার্তার মধ্যে না গিয়ে হঠাৎ বড়পুকুরিয়া ও ফুলবাড়ী দুই ক্ষেত্রেই উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের সরকারি সিদ্ধান্ত আপাতদৃষ্টিতে এক রহস্যজনক ব্যাপার। কিন্তু বাংলাদেশে যেভাবে এসব কাজ হয় তা অজানা নয়। এর মধ্যে প্রকৃতপক্ষে কোনো রহস্য নেই। যেভাবে এশিয়া এনার্জি সরকারি কর্মকর্তাদের উন্মুক্ত কয়লা উত্তোলন দেখে আশার জন্য খরচার জোগান দিয়েছে তার মধ্যেই এই রহস্যের ঠিকানা আছে।

সরকারের এটা মনে রাখা অবশ্য কর্তব্য যে জনগণ তাদের ভোট দিয়ে দেশের সম্পদের মালিক করেনি, তারা তাঁদের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করেছেন জনগণের সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ, সমৃদ্ধি ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য। কিন্তু ক্ষমতার গদিতে বসে সরকার ও তাদের আমলারা যে এর উল্টো কাজই সর্বত্র করে চলেছেন, এটা এক খোলাখুলি ব্যাপার। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও সরকারের নিজস্ব লোকজন কয়লা উত্তোলন নিয়ে চক্রান্তমূলকভাবে যা শুরু করতে যাচ্ছে তার গণবিরোধী, দেশবিরোধী ও সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ তোষণকারী চরিত্র বিষয়ে কোনো সংশয় নেই। তাদের এটা মনে রাখা দরকার যে দেশের সব সম্পদ, মাটির ওপরের ও নিচের সব সম্পদের মালিক জনগণ। সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের সঙ্গে যোগসাজশ ও চক্রান্ত করে দেশি-বিদেশি গণবিরোধী স্বার্থ কর্তৃক এই সম্পদ লুটপাট বন্ধ আবেদন-নিবেদনের মাধ্যমে সম্ভব নয়। সরকার যেমন নিজেদের ক্ষমতার মোহে জনগণের সম্পদ এভাবে লুটপাট করতে এবং এ কাজ করতে গিয়ে এলাকার জনগণের জীবনে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে উদ্যত হয়েছে, তেমনি জনগণ এই শত্রুতা প্রতিরোধের জন্য নিজেদের শক্তিকে সংগঠিত এবং ঐক্যবদ্ধ করবে। এর থেকে প্রমাণ হচ্ছে যে নির্বাচনে ভোট দিয়ে যাদের জনপ্রতিনিধি হিসেবে পাঠানো হয় তাঁরা প্রকৃত জনপ্রতিনিধি নন, জনগণের স্বার্থ তাঁরা দেখেন না। উপরন্তু ক্ষমতায় বসে জনগণের সঙ্গে শত্রুতা করাই হলো তাদের কাজ। এ শত্রুতার মোকাবিলা জনগণ সব সময়ই নিজেদের আন্দোলনের মাধ্যমে করেছে। বড়পুকুরিয়া ও ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগের মাধ্যমে সরকার জনগণের সম্পত্তি অপহরণ ও জীবনে বিপর্যয় সৃষ্টির জন্য যে নীতির ঘোষণা দিয়েছে, জনগণ নিজেদের ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত আন্দোলনের মাধ্যমেই তাকে পরাজিত করবে। এ ছাড়া বড়পুকুরিয়া ও ফুলবাড়ীর জনগণের সামনে দ্বিতীয় পথ আর কোনো খোলা নেই।
[সূত্রঃ কালের কণ্ঠ, ০৩/০৬/১০]

বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় সান্ধ্যকালীন শিফট

বদরুদ্দীন উমর


কয়েক বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন সান্ধ্যকালীন ক্লাস নেওয়ার অর্থাৎ সান্ধ্য শিফট চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখন আমি 'বিশ্ববিদ্যালয় না পাঠশালা?' নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রমণ্ডলী এই সান্ধ্য শিফটের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও এর বিরুদ্ধে অনেক প্রতিবাদ হয়। শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই প্রতিরোধের মুখে সান্ধ্য শিফট চালুর সিদ্ধান্ত বাতিল করে।

এ ঘটনার বেশকিছু আগে থেকে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শিফটের দাবি জানিয়ে আসছিল। শিক্ষা সম্মেলন করে সেখানেও তারা এই দাবির সপক্ষে অনেক আলোচনা করে এবং সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু লক্ষ্য করার বিষয় ছিল, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন সত্যি সত্যি দুই শিফট চালুর সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো তখন তার বিরুদ্ধে ছাত্রদের প্রতিক্রিয়া দেখে তারা আর এ নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করেনি। তারা এতদিন উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই শিফটের পক্ষে যে যুক্তি বিস্তার করেছিল, সে যুক্তির ফাঁকা চরিত্র ছাত্ররাই নিজেদের আন্দোলনের মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়েছিল।

এ প্রসঙ্গে 'বিশ্ববিদ্যালয় না পাঠশালা?' নামে যে প্রবন্ধ আমি লিখেছিলাম তাতে বলা হয়েছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস লেকচার আসলে শিক্ষার মুখ্য পদ্ধতি নয়, যেমন সেটা পাঠশালা বা স্কুলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষায় ক্লাস লেকচারের গুরুত্ব থাকলেও ছাত্রদের আসল কাজ করতে হয় লাইব্রেরি ও ল্যাবরেটরিতে। তাছাড়া যেখানে টিউটোরিয়াল ব্যবস্থা আছে, সেখানে টিউটোরিয়ালের কাজ করে। এই টিউটোরিয়াল পেপার তৈরির জন্য লাইব্রেরি কাজের কোনো বিকল্প নেই। ঢাকাসহ অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আজকাল যত ছাত্র ভর্তি করা হয়, তার জন্য উপযুক্ত কোনো ব্যবস্থাই নেই। এর মধ্যে সব থেকে বেশি হৈচৈ হয় আবাসিক ব্যবস্থা নিয়ে। খাওয়ারও কোনো ব্যবস্থা নেই। এ কারণে ছাত্রক্ষোভ, বিশেষত ছাত্রীদের নিজেদের হোস্টেলের কামরায় নিজেদেরই রেঁধে খেতে হয়। এটা যে কোনো কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেই এক কেলেঙ্কারি ব্যাপার। কারণ পড়তে এসে হোস্টেলে যদি ছাত্রছাত্রীদের রেঁধে খেতে হয়, তাহলে অহেতুক পরিশ্রম ও ক্লান্তির বিষয় বাদ দিয়েও পড়াশোনার জন্য সময় কমে আসে। তাছাড়া কামরাকে রান্নাঘর বানিয়ে রাখা এক অস্বাস্থ্যকর ব্যাপার। কিন্তু এসব দিকে খেয়াল করা বা এসব সমস্যা সমাধানের দিকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কোনো আগ্রহ আছে এমন মনে হয় না।

এ তো গেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া ছাত্রসংখ্যার তুলনায় তাদের থাকা-খাওয়ার অব্যবস্থার কথা। কিন্তু পড়াশোনার ক্ষেত্রে যে অসুবিধা তা হলো, ছাত্রসংখ্যার তুলনায় লাইব্রেরি ও ল্যাবরেটরি সুবিধা অনেক কম। বইপত্র এবং যন্ত্রপাতির কমতি তো আছেই, তার ওপর আছে স্থান সমস্যা। একসঙ্গে লাইব্রেরিতে বসে ছাত্রদের পড়াশোনা করার মতো জায়গার অভাব আছে। ল্যাবরেটরিতেও আছে প্রয়োজনীয় জায়গার অভাব। এ অবস্থায় যদি দ্বিতীয় শিফট করা হয়, তাহলে তার ফল কী দাঁড়াতে পারে, এটা অনুমান করা কঠিন নয়। এতে করে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রছাত্রীদের একটি হাটে পরিণত হয়ে শিক্ষার পরিবর্তে হট্টগোলের রাজত্বই সেখানে কায়েম হওয়ার কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই 'হাট' চরিত্র ইতিমধ্যেই দেখা যায় এবং হাটের হট্টগোল এখন এক নিয়মিত ব্যাপার।

যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শিফটের চিন্তা করেন, এমনকি তা কার্যকর করতে নিযুক্ত হন, তাদের বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে ধারণার অভাব আছে। তারা মনে করেন, লেকচারই হলো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মূল পদ্ধতি। কাজেই লেকচারে উপস্থিত থেকে শিক্ষকদের বক্তৃতা শুনলেই ছাত্রদের উচ্চশিক্ষা এগিয়ে যায়। তার জন্য অন্য বিশেষ কিছুর প্রয়োজন হয় না। এই চিন্তা যদি তাদের মধ্যে না থাকত, তাহলে তারা অবশ্যই ভাবতেন লাইব্রেরি ও ল্যাবরেটরির অবস্থার কথা, সেখানে ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা ও ল্যাবরেটরি কাজের বাস্তব অবস্থার কথা।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার আছে। আজকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব শিক্ষক আছেন, তাদের একটা বড় সংখ্যা বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিরিক্ত অধ্যাপনার কাজে নিযুক্ত থাকেন। এ কাজ করতে গিয়ে তারা নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার কাজে যথাযথভাবে মনোযোগ দেন না, সেখানে সময় দেন না এবং ক্লাস লেকচারের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে নিয়মিত পড়াশোনাও করেন না। এর ফলে তাদের পক্ষে যতটুকু পাঠ ছাত্রদের দেওয়া সম্ভব, সেটা দেওয়াও তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি সুসংগঠিত পাঠ ও গবেষণার ব্যবস্থা থাকে, তাহলে বলার কিছু নেই। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকরা যদি নিজেদের দায়িত্ব পালন না করে অতিরিক্ত অর্থের সন্ধানে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে সময় দেন, তাহলে সেটা উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ক্ষতিকর হতে বাধ্য। সে ক্ষতি অবশ্যই হচ্ছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষকদের এই দায়িত্বহীনতা রোধ করতে সক্ষম হচ্ছে না। সন্দেহ হয়, এর কোনো গুরুত্ববোধও তাদের মধ্যে নেই এবং তারা এর বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিতেও আগ্রহী নন। আজকের পত্রিকায় (ডেইলি স্টার, ২৪.৫.২০১০) দেখা যাচ্ছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ 'কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টে'র সান্ধ্যকালীন মাস্টারসের প্রোগ্রাম শুরু করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ওই ডিপার্টমেন্টের ছাত্রছাত্রীরা এই প্রোগ্রাম বাতিলের দাবিতে ক্লাস বর্জন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই 'বাণিজ্যিক কোর্স' বন্ধের দাবিতে কার্জন হলের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। তাদের কথা হলো, ডিপার্টমেন্টে শিক্ষকের সংখ্যা কম, তার ওপর এই শিক্ষকরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষকতা করেন। এর ফলে তাদের পক্ষে
রহ-পড়ঁৎংব ও সরফ-ঃবৎস পরীক্ষা সময়মতো নেওয়া সম্ভব হয় না। এছাড়া তারা পরীক্ষা হয়ে যাওয়ার পর সময়মতো পরীক্ষার ফল প্রকাশ করতে পারেন না, কারণ খাতা দেখার সময় তাদের হয় না। এ অবস্থায় আবার সান্ধ্যকালীন কোর্স চালু হলে ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার অবস্থা কী দাঁড়াবে, তা সহজেই অনুমান করা যায়। এই পরিস্থিতিতে ছাত্ররা অবিলম্বে দ্বিতীয় শিফট সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত বাতিলের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, কয়েকদিন আগে প্রকাশিত একটি সংবাদপত্র রিপোর্টে দেখা যায়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ও একটি ডিপার্টমেন্টে সান্ধ্যকালীন দ্বিতীয় শিফট চালুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এর থেকে বোঝা যাচ্ছে, কিছুদিন আগে উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণের অজুহাত দেখিয়ে বাণিজ্যিক কারণে দ্বিতীয় শিফট চালুর যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল এবং যা মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই প্রতিরোধের মুখে বাতিল করা হয়েছিল, সেই বাণিজ্যিক প্রোগ্রাম এখন আবার গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে একযোগে চালু না করে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন বিভাগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কর্তৃক চালু করার ব্যবস্থা হচ্ছে।

বাংলাদেশে নিম্নতম থেকে উচ্চতম পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার বেহাল অবস্থা এক বাস্তব ব্যাপার। তার ওপর এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দ্বিতীয় শিফট চালু করে এগুলোকে পাঠশালা বানানোর যে ব্যবস্থা হচ্ছে সেটা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদেরই নয়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মরত শিক্ষক, শিক্ষিত সম্প্রদায় ও সেই সঙ্গে সামগ্রিকভাবে সচেতন জনগণের প্রতিরোধ দরকার। এই প্রতিরোধের দ্বারা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দ্বিতীয় শিফট চালুর মাধ্যমে ইতিমধ্যেই বাণিজ্যিকীকরণকৃত শিক্ষাব্যবস্থার আরও শোচনীয় বাণিজ্যিকীকরণ যদি বন্ধ করা না হয়, তাহলে কার্যকরভাবে শিক্ষাব্যবস্থার ধ্বংস রোধ করা হবে এক অসম্ভব ব্যাপার।
(সুত্র, সমকাল, ২৫/০৫/২০১০)

নামকরণ পরিবর্তনের মহোত্সব দুর্নীতিরই দৃষ্টান্ত

বদরুদ্দীন উমর


বিভিন্ন রকম প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনার নামকরণ নিজের পিতার নাম অনুযায়ী করার এক উদগ্র তাগিদ বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে প্রায় দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য করে রেখেছে। তিনি শুধু নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনার নাম নিজের পিতার নামে রেখেই ক্ষান্ত হচ্ছেন না। অনেক বিদ্যমান প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনার নাম পর্যন্ত পরিবর্তন করে নিজের পিতার নাম সেখানে বসিয়ে দিচ্ছেন। এখানেই শেষ নয়, তিনি নিজের মাতা এবং ভাইদের নামেও এ ধরনের নামকরণ করছেন। এ কাজের মধ্যে রুচির দোষ যাই থাকুক, অন্যদিক দিয়ে বিচার করলে এটা এক ধরনের দুর্নীতিও বটে। কারণ শাসনক্ষমতার অধিকারী হয়ে বিভিন্ন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নাম এভাবে রাখার মধ্যে পারিবারিক গৌরব কীর্তন ছাড়া অন্য উদ্দেশ্য নেই। এই উদ্দেশ্য যে কোনো গৌরবজনক ব্যাপার নয়, এটা বলাই বাহুল্য। লক্ষণীয় ব্যাপার এই যে, তিনি শুধু নিজের পিতার নামে এভাবে নামকরণ করেই থেমে থাকছেন না। তার প্রতিহিংসাপরায়ণতা এমন যে, তিনি যাদেরকে তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেন তাদের নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনার নাম পরিবর্তন করে যেখানে তার পিতার নামে মোটেই রাখা সম্ভব হচ্ছে না, সেখানে অন্য কারোর নামে তার নতুন নামকরণ করছেন। যেভাবে নাম পরিবর্তনের কাজ করা হচ্ছে তার থেকে মনে হতে পারে যে, ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে জনগণ ভোটের কল্যাণে আওয়ামী লীগকে এ কাজ করার জন্য ম্যান্ডেট দিয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা ক্ষমতায় থেকে এই একই কাজ করলেও নাম পরিবর্তনের এই কুিসত ব্যাপার সবমাত্রা অতিক্রম করে কুরুচি ও অসভ্যতার এমন পরিচয় রাখছে, যা একটি দেশ ও জাতির জন্য কলঙ্কজনক।

ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম প্রথম থেকেই ছিল জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এই বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন করে এখন রাখা হয়েছে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। একজন বড় মাপের পীর সাহেবের নামে এই নামকরণের কারণ এই ধারণা যে, পরে কেউ এই নাম পরিবর্তন করতে গেলে দেশের ধর্মপ্রাণ লোকদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগবে—এই ভয়ে কেউ আর সে চেষ্টা করবে না। এখানে প্রতিহিংসার হীন প্রকৃতি ছাড়াও ধর্মকে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে তার মধ্যেও প্রশংসার কিছু নেই। এখানে বলা দরকার যে, মওলানা ভাসানীর নামও এভাবে মুছে ফেলা হচ্ছে। ঢাকার নভোথিয়েটারের নাম ভাসানী নভোথিয়েটারের পরিবর্তে রাখা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর পিতার নামে।

বিদ্যমান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন করতে গিয়ে যে বিশাল অংকের বৈদেশিক মুদ্রাসহ মোট অর্থ ব্যয় হয়েছে এটা বাংলাদেশের মতো একটি দেশের স্বার্থবিরোধী কাজ ছাড়া আর কী? শুধু নিজের ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থের জন্য দেশের মেহনতি জনগণের ঘাড়ে এই ব্যয়ভার চাপিয়ে দেয়ার কী এখতিয়ার আওয়ামী লীগের প্রধানমন্ত্রীর আছে? তিনি নিজের পিতার নামে আরও বিশাল এক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তার জন্য বিদ্যমান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটির নাম পরিবর্তনের কী প্রয়োজন ছিল? প্রতিহিংসাপরায়ণতা ছাড়া এর আর কী ব্যাখ্যা থাকতে পারে? আমরা জিয়াউর রহমানের পক্ষপাতী নই, তার নামে কোনো কিছুর নামকরণ থাকুক বা না থাকুক তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না। কিন্তু বিদ্যমান নাম পরিবর্তন করে দেশকে আর্থিক ক্ষতির মধ্যে নিক্ষেপ করার আমরা ঘোর বিরোধী।

বাংলাদেশে এখন দুর্নীতির প্রবল রাজত্ব। এই দুর্নীতি যে কত বিচিত্র পথগামী তার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবেই নামকরণের বিষয়টি উল্লেখ করা হলো। দুর্নীতি বলতে সাধারণত অর্থনৈতিক দুর্নীতি অর্থাত্ চুরি, ঘুষ, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ইত্যাদির কথা মনে হয়। কিন্তু দুর্নীতি আসলে হলো এক ধরনের অভ্যাসগত সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতি মানুষের চেতনা থেকে নিয়ে কাজকর্মের পুরো জগেকই আচ্ছন্ন করে রাখে। কাজেই এর প্রতিফলন ঘটে সর্বত্র। মিথ্যা, প্রতারণা ইত্যাদি এই সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।

বাংলাদেশে শাসকশ্রেণীর একের পর এক সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হলেও দুুর্নীতির চর্চা তাদের মধ্যে প্রবল। এই দুর্নীতির সব থেকে উল্লিখিত দিক হলো তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের এ বিষয়টি পূর্ব-নির্ধারিত। কারণ প্রতিশ্রুতির ফিরিস্তি তৈরি করার সময় তারা জানে যে, এসব প্রতিশ্রুতি তারা পূরণের জন্য দেয় না। এগুলো দেয়া হয় ভোটারদের প্রতারিত করার উদ্দেশ্যেই।

বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার আগে ভোটারদের সামনে সাজানো-গোছানো এমনসব রঙিন প্রতিশ্রুতি হাজির করেছিল যার তুল্য আকর্ষণীয় প্রতিশ্রুতি অন্য কেউ, এমনকি তারা নিজেরাও এর আগে দেয়নি। একদিকে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ও মইনউদ্দীন-ফখরুদ্দীন সরকারের সাত বছরের শোষণ-নির্যাতনে জর্জরিত হয়ে এবং অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের ১৯৯৬-২০০১ সালের কীর্তিকলাপের কথা মনে না রেখে তাদের রঙিন প্রতিশ্রুতি দ্বারা বিভ্রান্ত হয়ে ভোটাররা আওয়ামী লীগকে বিগত নির্বাচনে বড় আকারে জিতিয়ে দিয়েছে। অন্যভাবে দেখলে বলা চলে যে, তাদের অন্য কিছু করারও থাকেনি। কারণ বিএনপিকে বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ ছাড়া তাদের সামনে কোনো বিকল্প ছিল না। বস্তুতপক্ষে বাংলাদেশের ভোটাররা যে নির্বাচনী কাঠামোর মধ্যে এখন বন্দি এবং যে শর্তে ওই নির্বাচন হয় তাতে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে একটিকে বাদ দিলে অন্যটি ছাড়া কোনো বিকল্প তাদের সামনে থাকে না। কাজেই প্রকৃতপক্ষে বিকল্পের অভাবেই ভোটাররা বিগত নির্বাচনে বাধ্য হয়ে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করেছে। নির্বাচনে জয়লাভ করে জাতীয় সংসদে বসে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় সংসদের ঐতিহ্য রক্ষা করছে। প্রতিপক্ষকে কথাবার্তার প্রয়োজনীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত রেখে সরকারদলীয় স্পিকার তার কর্তব্য পালন করে যাচ্ছেন। অন্যদিকে সরকারি ও বিরোধী দল দেশের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার পরিবর্তে দলীয় মতলববাজি এবং খিস্তিখেউর নিয়ে সংসদে বাক্যবিস্তার করে চলার ফলে কোনো গণতান্ত্রিক দায়িত্বই তাদের দ্বারা পালিত হয় না। এসবই হলো নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দুর্নীতির এক ধরন। এই দুর্নীতি তাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করে ক্ষমতায় বসে আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে, এমন কথা বলা যাবে না। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির ছিটেফোঁটা ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় তাদের নেই। তারপরও তারা এমন সব কাজ করে যাচ্ছে যার সঙ্গে তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কোনো সম্পর্ক নেই। দেশের জনগণের স্বার্থের কোনো সম্পর্ক নেই। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক তার পিতা এবং অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনার নামকরণ এবং প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে এসব থেকে অন্যদের নাম মুছে ফেলার যে ‘কর্মসূচি’ গ্রহণ করেছেন সেটা তাদের নানা ধরনের দুর্নীতিরই অন্যতম দৃষ্টান্ত।
[সূত্রঃ আমার দেশ, ১৩/০৫/১০]

বাংলাদেশের খনিজসম্পদ এবং লুণ্ঠনজীবীরা

বদরুদ্দীন উমর


মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া সংরক্ষিত বনাঞ্চলে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য সরকার আমেরিকান তেল কোম্পানি শেভরনকে অনুমতি দেওয়ার বিরুদ্ধে অনেক প্রতিবাদ হয়েছিল। এর যুক্তিসম্মত কারণ এই ছিল যে, এ বনাঞ্চলে বহু ধরনের দুষ্প্রাপ্য প্রাণীর বাস। নানা জাতের পশুপাখি থেকে নিয়ে সরীসৃপের অস্তিত্বের জন্য এ বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ। তেল কোম্পানি সেখানে ভারী ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে, আওয়াজ দিয়ে অনুসন্ধান কাজ চালিয়ে গেলে তার দ্বারা পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট হয়ে সেখানকার প্রাণিজগতের সমূহ ক্ষতির সম্ভাবনা। কিন্তু সরকার এ বিষয়ে ভ্রুক্ষেপ না করে শেভরনকে গ্যাস অনুসন্ধানের অনুমতি দিয়েছিল। ফলে লাউয়াছড়ার জীবজন্তু, পাখি, সরীসৃপ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, কীভাবে তাদের অনেকে লোকালয়ে বের হয়ে দুর্বৃত্ত প্রকৃতির লোকজনের হাতে নিধন হয়েছিল তার অনেক রিপোর্ট সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। এখন এদিক দিয়ে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। বর্তমান সরকার আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদী তেল কোম্পানি শেভরনকে লাউয়াছড়ায় গ্যাস উত্তোলনের চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদান করেছে। বিস্ময়ের ব্যাপার, এ নিয়ে দেশে কোনো প্রতিবাদ নেই। একমাত্র জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল ছাড়া এর বিরুদ্ধে কেউ মিছিল-সমাবেশ করেনি, বিবৃতিও দেয়নি। ৭ মে এই একমাত্র প্রতিবাদের শুধু ছবি ইংরেজি 'নিউ এজ' পত্রিকায় ৮ মে তারিখে প্রকাশিত হওয়া ছাড়া অন্য কোথাও এর রিপোর্ট প্রকাশিত হয়নি। 'জাতীয় তেল-গ্যাস, বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা কমিটি' চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনে তাদের সাত দফা দাবি বাস্তবায়নের জন্য ৯ মে ঢাকার পল্টন থেকে জাতীয় প্রেসক্লাব পর্যন্ত কয়েক মিনিটের এক পদযাত্রা করলেও তার মধ্যে লাউয়াছড়ায় শেভরনকে গ্যাস উত্তোলনের অনুমতি প্রদানের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ দেখা যায়নি (কালের কণ্ঠ, ১০-৫-১০)। অথচ এই অনুমতির ফলে শেভরন যে লাউয়াছড়া সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও সে সঙ্গে সেখানকার জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করবে_ এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এসব যে ওপরতলার সরকারি কর্তৃপক্ষকে সন্তুষ্ট করেই হচ্ছে এতেও বাংলাদেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সন্দেহের লেশমাত্র কারণ নেই।

আমেরিকান শেভরন কোম্পানি যে সরকারের কত পেয়ারের জিনিস তার ওপর ৮ মে দৈনিক যুগান্তরে একটি বড় রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। রিপোর্টটির একটি অংশ এখানে উদ্ধৃত করলে আলোচনার সুবিধা হবে। এতে বলা হয়, 'আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি (আইওসি) শেভরনের বাংলাদেশ অফিসে ৮২ জন বিদেশিকে বছরে ১৮৫ কোটি টাকা বেতনভাতা দেওয়া হয়। অথচ ৮৮০ জন স্থানীয় স্টাফ বছরে পান মাত্র ৮৬ কোটি টাকা। প্রতি বছর শেভরন তিনটি গ্যাস ক্ষেত্রের পরিচালনা বাবদ সরকারের কাছ থেকে এ অর্থ আদায় করে। উৎপাদন-বণ্টন চুক্তির (পিএসসি) ফাঁকফোকরে শেভরন সরকারকে কোনো আয়কর শুল্কও দেয় না। স্থানীয় ও বিদেশিদের মধ্যে বিশাল বেতন বৈষম্য, অপ্রয়োজনীয় বিদেশি নিয়োগসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে শেভরনের বিরুদ্ধে। দেশীয় প্রকৌশলী বা বিশেষজ্ঞ থাকা সত্ত্বেও সেই পদে বিদেশি নিয়োগ এবং একই পদে নানা উপাধিতে একাধিক বিদেশির নিয়োগ নিয়ে পেট্রোবাংলা বারবার আপত্তি দিয়েছে। কিন্তু মার্কিন এ কোম্পানির স্বেচ্ছাচার কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে রহস্যজনকভাবে সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয় না। অভিযোগ রয়েছে, পেট্রোবাংলা এবং জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কয়েক পদস্থ কর্মকর্তাকে খুশি করে শেভরন তাদের বাজেট অনুমোদন করে নিচ্ছে।' এতে আরও বলা হচ্ছে, 'জালালাবাদ, মৌলভীবাজার এবং বিবিয়ানায় সরকারের লাভের গ্যাস সরকার কিনে তাদের এ পরিচালনা ব্যয় পরিশোধ করে।'

এ হলো লাভের গুড় পিঁপড়ায় খাওয়ার মতো ব্যাপার। রিপোর্টটিতে এ বিষয়ে আরও অনেক বিস্তারিত বিবরণ আছে, যার উল্লেখ এখানে নিষ্প্রয়োজন। ওপরের রিপোর্টে যা বলা হয়েছে তার থেকেই বেশ ভালোভাবে বোঝা যায়, আমাদের দেশের 'দেশপ্রেমিক' সরকার সাম্রাজ্যবাদের হাতে দেশের সম্পদ কীভাবে তুলে দিচ্ছে; জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষস্থানীয় যারা বসে আছেন তারা পেট্রোবাংলাসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মাধ্যমে দেশের খনিজসম্পদ কীভাবে সাম্রাজ্যবাদী কোম্পানিকে লুটপাট করতে দিয়ে সেই লুটের একটা বখরা নিজেদের পকেটে ফেলে অর্থ-সম্পদের মালিক হচ্ছেন।

যে সাম্রাজ্যবাদী বিদেশি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের বিভিন্ন খনিজসম্পদের ওপর লোলুপ দৃষ্টি রেখেছে এবং বাস্তবত উত্তোলনের কাজে নিযুক্ত আছে, তাদের মধ্যে মার্কিন কোম্পানি শেভরনই সব থেকে শক্তিশালী এবং বাংলাদেশ সরকারের সব থেকে আদরের। এটা হওয়ারই কথা, কারণ এর সঙ্গে সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। উপরোক্ত গ্যাস ক্ষেত্রগুলো অন্যান্য মার্কিন কোম্পানির হাত থেকে এখন শেভরনের হাতে এসেছে এবং এরাই এখন বাংলাদেশে গ্যাসের সামগ্রিক কারবারে সর্বোচ্চ স্বেচ্ছাচারিতার দৃষ্টান্ত রাখছে।

বাংলাদেশে গ্যাস ও কয়লার সন্ধান পাওয়ার পর থেকে সাম্রাজ্যবাদী বিদেশি কোম্পানির কাছে যে কোনো শর্তে এসব উত্তোলনের কাজ দেওয়ার জন্য শাসকশ্রেণীর দালাল মুৎসুদ্দিরা এই যুক্তি দেখায়, মাটির তলায় এসব ফেলে রাখা অর্থহীন। কাজেই এগুলো যথাশিগগির তুলে ফেলে যা পাওয়া যায় তাই সংগ্রহ করা দরকার! এর থেকে মূঢ় এবং সে সঙ্গে দুর্নীতিবাজ বক্তব্য আর কী হতে পারে? মাটির তলায় খনিজসম্পদ থাকা মানে চিরতরে পড়ে থাকা নয়। সেটা অবশ্যই তোলা দরকার। কিন্তু কখন ও কী শর্তে সেটা তোলা যাবে এ বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তেল-গ্যাসের যে মজুদ আছে তার একটি বড় অংশ তারা নিজেরা না তুলে মাটির নিচেই রেখে দিয়েছে প্রয়োজন অনুযায়ী, বিশেষত আপৎকালে, জরুরি অবস্থায় ব্যবহারের জন্য। নিজেদের তেল-গ্যাস এভাবে মাটির নিচে রেখে তারা মরিয়া হয়ে বিশ্বজুড়ে তেল-গ্যাস লুণ্ঠনের জন্য যুদ্ধ পর্যন্ত করছে। আর আমাদের দেশের দুর্নীতিবাজ ও দেশীয় স্বার্থবিরোধী শাসকচক্র দেশের সম্পদ চরম ক্ষতিকর শর্তে ও হীন স্বার্থে বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী কোম্পানিগুলোর হাতে তুলে দিচ্ছে।

এশিয়া এনার্জি নামে যে ব্রিটিশ কোম্পানিকে তারা ফুলবাড়ীর কয়লা উত্তোলনের ইজারা দিতে চেয়েছিল এবং এখনও তার জন্য নতুনভাবে চক্রান্ত ও পাঁয়তারা করছে, সেখানে ফুলবাড়ীর কয়লার মাত্র ৬ শতাংশ ছিল বাংলাদেশ সরকারের প্রাপ্য। বাকি ৯৪ শতাংশ পাওনা হতো এশিয়া এনার্জির। অর্থাৎ এর অর্থ হলো আমাদের দেশের মাটির তলায় আমাদের সম্পদ ফেলে না রেখে এগুলো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যে কোনো শর্তে সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে তুলে দেওয়া, তাদের দ্বারা লুণ্ঠিত হতে দেওয়াই হলো দেশপ্রেমমূলক কর্তব্য!! এই হলো বাংলাদেশের শাসকশ্রেণীর চরিত্র। সাম্রাজ্যবাদী লুণ্ঠনজীবীদের (ঢ়ৎবফধঃড়ৎ) সেবাদাস হিসেবে এখানকার লুণ্ঠনজীবীদের অধীনতার সম্পর্কের মাধ্যমেই দেশীয় সম্পদ এভাবে বিদেশিদের কাছে পাচার হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে যারা দুর্নীতি করছে তারা শাসকশ্রেণী ও সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের লোক। তারা বিদেশিদের সঙ্গে এই সম্পর্কের মাধ্যমে বিদেশে নিজেদের লুণ্ঠনের বখরা পাচার করছে। তারা এতই ধূর্ত যে, দেশের সাধারণ আইন-কানুন দিয়ে এদের দুর্নীতি ও দেশীয় স্বার্থবিরোধী কাজের জন্য শাস্তি দেওয়ার উপায় নেই।
(সুত্র, সমকাল, ১১/০৫/২০১০)

জনগণ এখন শুধু সরকার পরিবর্তন নয় সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন চান

বদরুদ্দীন উমর


বাংলাদেশের জনগণ আজ হাজারও সমস্যায় জর্জরিত ও বিক্ষুব্ধ। জনগণের ওপর, বিশেষত বিপুল অধিকাংশ শ্রমজীবী জনগণের ওপর শোষণ-নির্যাতন কোন নতুন ব্যাপার নয়। এমন কোন সময় এ অঞ্চলে দেখা যায়নি যখন এ অবস্থার কোন ব্যতিক্রম ছিল। ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলে এ দিক দিয়ে জনগণের জীবনযাত্রা ও জীবন সংগ্রামের একটা ধারাবাহিকতা আছে।

এর প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে জনগণের মধ্যেও পরিবর্তনের একটা তাগিদ স্বাভাবিকভাবেই দেখা যাচ্ছে। জনগণের একটা ক্ষুদ্র অংশ সমগ্র সমাজব্যবস্থা পরিবর্তনের একটা তাগিদ অনুভব করলেও বিপুল অধিকাংশ মানুষই এই পরিবর্তন বলতে বুঝেছেন সরকার পরিবর্তন। বিদ্যমান সরকারের শোষণ-নিপীড়নের দ্বারা জর্জরিত হয়ে তারা মনে করেছেন, সেই সরকারের পরিবর্তন হলে অবস্থার কিছু পরিবর্তন হবে। কাজেই তারা নির্বাচনের মাধ্যমে এই পরিবর্তনের চেষ্টা করেছেন। এক সরকারের পরিবর্তে অন্য সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে তাদের ওপর শোষণ-নির্যাতনের কিছু কমতি হবে, এটা এমনভাবে তাদের বিশ্বাসের অংশে পরিণত হয়েছিল যে, বারবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে কোন সুফল না পাওয়া সত্ত্বেও তারা একই প্রত্যাশায় বুক বেঁধে ভোট দিয়ে এসেছেন।

সরকার পরিবর্তন সত্ত্বেও পরিস্থিতির পরিবর্তন না হওয়ায় তাদের মধ্যে এক ধরনের হতাশার সৃষ্টি হলেও তারা চিন্তাগত অভ্যাসের বশবর্তী হয়ে এর পরও নির্বাচনে ভোট দিয়ে এক দলের পরিবর্তে অন্য দলকে ক্ষমতায় বসিয়েছেন। এ অবস্থা ১৯৯৬ সাল থেকে দেখা গেছে। এর সর্বশেষ দৃষ্টান্ত হল ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচন। বিএনপি ও বেনামি সামরিক সরকারের সাত বছরের শাসনকালে জনগণ যেভাবে বিপর্যস্ত জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়েছিলেন, তার পরিবর্তনের জন্য তারা আওয়ামী লীগকে ভোট দেন। প্রতিবারের মতো এবারও নির্বাচনী দলগুলোর ভুয়া প্রতিশ্র“তির অভাব ছিল না। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রতিশ্র“তি ছিল সব থেকে রঙিন। সাত বছরের অন্য দলীয় শাসনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ এবং আওয়ামী লীগের রঙিন প্রতিশ্র“তির দ্বারা মোহাবিষ্ট হয়ে জনগণ তাদের নির্বাচনে জিতিয়ে দেন।

এই বড় আকারের নির্বাচন বিজয়ের পর আওয়ামী লীগ শাসক শ্রেণীর কয়েকটি ছোটখাটো দলকে লেজে বেঁধে গঠন করে তাদের তথাকথিত মহাজোট সরকার। কিন্তু বিএনপি-জামায়াতের জোট সরকার এবং মইন-ফখরুদ্দীনের বেনামি সামরিক সরকারের শাসনের অবসান হলেও পরিস্থিতির কোন পরিবর্তন তো হল না, হওয়ার কথাও নয়। দেখা গেল, পূর্ববর্তী সময়ের মতো এবারও জনগণ বিভ্রান্ত ও প্রতারিত হয়েছেন। শুধু তাই নয়, এবারের মিথ্যা নির্বাচনী প্রতিশ্র“তি তাদের এমনভাবে বিভ্রান্ত ও প্রতারিত করেছে, যার পূর্ব দৃষ্টান্ত নেই। এর কারণ আওয়ামী লীগ এবার তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্র“তি বড় আকারে এবং নানা বর্ণে রঞ্জিত করে জনগণের সামনে উপস্থিত করেছিল। এই বড় ও আকর্ষণীয় প্রতিশ্র“তি পালনের কোন লক্ষণই বর্তমান সরকারের মধ্যে না দেখে জনগণ অল্পদিনের ভেতরেই তাদের প্রতি মোহমুক্ত হয়েছেন, যা ইতিপূর্বে এত তাড়াতাড়ি কখনও দেখা যায়নি। মাত্র পনের-ষোল মাসের মধ্যেই বর্তমান সরকার নিজের লুণ্ঠনজীবী (চৎবফধঃড়ৎু) চরিত্র জনগণের সামনে এমনভাবে উšে§াচিত করেছে যা প্রতারিত হতে অভ্যস্ত বাংলাদেশের জনগণকে শুধু বিস্মিতই করেনি, তাদের চোখ খুলে দিয়েছে। এই সরকারের চুরি, দুর্নীতি, লুণ্ঠন ও তার সঙ্গে সন্ত্রাস যুক্ত হয়ে দেশে যে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে ও যেভাবে করেছে, এটা আগে দেখা যায়নি।

এই নৈরাজ্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। নিজেদের মূল রাজনৈতিক দলের ক্ষমতার জোরে প্রথমদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় এবং পরে তার সঙ্গে সমাজের ব্যাপকতর ক্ষেত্রে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, গুণ্ডামি, খুনখারাবি করে চারদিকে তারা এক ভয়াবহ বিশৃংখল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। এটা ঘটছে এমন অবস্থায়, যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের অবাধ ও আকাশচুম্বী মূল্য বৃদ্ধি, কাজ ও মজুরির অভাব, কৃষি ও শিল্পক্ষেত্রে নৈরাজ্য, জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তার অভাবে সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ রয়েছে।

সরকারের ছত্রছায়ায় ষোল মাস ছাত্রলীগ তাদের দুর্নীতি ও সন্ত্রাস চালিয়ে এখন এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে, যাতে চারদিকে এর বিরুদ্ধে জনমত প্রবল হয়েছে। এই প্রবল বিরুদ্ধ জনমত শেষ পর্যন্ত আওয়ামী সরকারকে তাদের ছাত্র সংগঠনটির বিরুদ্ধে কিছু পদক্ষেপ নেয়ার তোড়জোড় দেখাতে বাধ্য করেছে। তারা পুলিশকে এতদিনে হুকুম দিয়েছে বিশৃংখলা সৃষ্টিকারী ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে। কিন্তু এই হুকুম কতটুকু কার্যকর হবে, সেটা বোঝায় অসুবিধা নেই। কারণ এ ধরনের কাজ শুধু ছাত্রলীগই করছে তাই নয়, যুবলীগ, মহিলা লীগসহ তাদের রঙবেরঙের অনেক লীগই এ কাজ করছে। কাজেই এ দিক দিয়ে ছাত্রলীগের অবস্থা হয়েছে ‘সকল পক্ষী মৎস্যভক্ষী মৎস্যরাঙা কলঙ্কিনি’র মতো।

আওয়ামী লীগের দলীয় নেতাকর্মীরা তো আছেই, তার ওপর তাদের এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান, মেম্বর ইত্যাদি লোকরা বিভিন্ন স্তরে ‘গডফাদার’ নামক অপরাধী চক্রের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে এখন সর্বত্র সক্রিয়। বস্তুতপক্ষে ছাত্রলীগ তাদের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের এই চক্রের পৃষ্ঠপোষকতাতেই এবং তাদের দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের কাঠামোর মধ্য থেকেই নিজেরা দুর্নীতি ও সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব এখন তাদের ছাত্র সংগঠন নিয়ন্ত্রণের জন্য হম্বিতম্বি করলেও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা জানে, তাদের দলের নেতৃস্থানীয় লোকজন একই কাজ অবাধে ও বেপরোয়াভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। শুধু চালিয়ে যাচ্ছে তাই নয়, এ কাজ থেকে তাদের বিরত রাখা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগের রাজনীতি ও সংগঠন দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের সঙ্গে এত ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত যে, এই দলকে এ দুই থেকে বিযুক্ত করার চেষ্টার অর্থ হল তাকে ভেঙে ফেলা। কে চায় নিজেদের দলকে নিজেরাই ভেঙে ফেলতে?

মাত্র ক’দিন আগে বিএনপির রাজশাহী সমাবেশে বিভিন্ন এলাকা থেকে সেখানে যাওয়ার পথে কিভাবে আওয়ামী লীগের গুণ্ডাপাণ্ডারা তাদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে খুন-জখম করছে, তার বিবরণ সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। বিএনপি জনস্বার্থের প্রতিনিধি নয়, তাদের মধ্যেও দুর্নীতি, প্রতারণা, সন্ত্রাস ইত্যাদির অভাব নেই। তারা আওয়ামী লীগের শ্রেণী ভাই। তা সত্ত্বেও দলীয় স্বার্থে আওয়ামী লীগ তাদের ওপর যে হামলা চালাচ্ছে, তাতে তার ফ্যাসিস্ট চরিত্র স্পষ্ট। এই সরকার যে শুধু তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী শ্রেণী দলকেই আক্রমণ করছে তা নয়। তারা আরও কঠোরভাবে নানা কায়দায় তাদের হামলা পরিচালনা করছে প্রগতিশীল সংগঠনের ওপর। তাদের সভা, সমাবেশ, মিছিলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে এবং পুলিশি হামলা চালিয়ে তাদের শ্বাসরুদ্ধ করছে।

কাজেই ছাত্রলীগের বর্তমান সন্ত্রাসী তৎপরতাকে আওয়ামী লীগের এই নীতি ও তৎপরতা থেকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার চেষ্টা অবাস্তব। ঠিক একই কারণে ছাত্রলীগ দমনের জন্য তাদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের কঠোর হওয়ার হুমকি যে তাদের প্রতারণার আর একটি দৃষ্টান্ত, এতে সন্দেহ নেই। তাদের এখন বাধ্য হয়ে এ কাজ করতে হলেও এর দ্বারা পরিস্থিতি সামাল দেয়ার কোন সম্ভাবনা তাদের নেই। যে রোগ দ্বারা আওয়ামী লীগ সর্বস্তরে নিজেরাই আক্রান্ত, ছাত্রলীগের সেই একই রোগ তারা সারাবে কিভাবে?

বর্তমান সরকারের ক্ষমতাসীন হওয়ার ষোল মাসের মধ্যেই জনগণ এখন পরিবর্তনের বিষয়ে নতুনভাবে চিন্তা-ভাবনা করছেন। ‘যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ’Ñ এই চলতি কথার সারমর্ম এখন তারা উপলব্ধি করছেন। এক্ষেত্রে লঙ্কায় যাওয়ার অর্থ হল নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারের গদিতে বসা।
আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ শাসক শ্রেণীর সব দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, শোষণ, নির্যাতন ও প্রতারক চরিত্র জনগণ এখন গভীরভাবে উপলব্ধি করছেন। এই উপলব্ধি চিন্তার ক্ষেত্রে তাদের এমন জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে, যাতে তারা এখন আর শুধু সরকার পরিবর্তনের মধ্যে আশার ক্ষীণতম আলোও দেখেন না। তারা এ বিষয়ে নিশ্চিত যে, ভোট দিয়ে সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে তাদের জীবনের কোন সমস্যার সমাধানই সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন বিদ্যমান সমাজব্যবস্থা ও শাসন কাঠামোর আমূল পরিবর্তন। এই পরিবর্তন কিভাবে ঘটবে এবং কারা এই পরিবর্তন ঘটাবে, এ বিষয়ে তাদের স্পষ্ট ধারণা এখনও না থাকলেও এই পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে তারা নিঃসন্দেহ এবং এর তাগিদ তারা অনুভব করছেন। তাদের চেতনার এই পরিবর্তন যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক বড় ধরনের ইতিবাচক দিক এ বিষয়ে কোন সংশয় নেই।
[সূত্রঃ যুগান্তর, ০৯/০৫/১০]